আগামী মাসে কয়লাভিত্তিক বরিশাল ৩০৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল কাজ শুরু হচ্ছে। এরই মধ্যে ভূমি উন্নয়নের কাজ শেষ হয়েছে। আগামী মাসে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজের পাশাপাশি মূল কেন্দ্র নির্মাণের কাজও শুরু হবে বলে জানিয়েছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বরিশাল ইলেকট্রিফিকেশন কোম্পানির কর্মকর্তারা। তারা জানান, এখন যে গতিতে কাজ চলছে, এতে করে ২০২২ সালের আগেই কেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে পারবে।
এদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বেসরকারি খাতের মধ্যে এই কেন্দ্রটির কাজই ঠিক মত চলছে। বেসরকারি খাতের অন্যান্য কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো যেসব কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে, এর কোনোটিই এখন পর্যন্ত ভূমি উন্নয়নের কাজই শুরু করতে পারেনি। বিদ্যুৎ খাতের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী সরকার বেসরকারি খাতে এই কেন্দ্রটি নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রটি নির্মাণের উপর নিবিড় পর্যবেক্ষণও করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার খালেদ মাহমুদ কেন্দ্রটি সম্পর্কে বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাত নিয়ে সরকারের মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে। কোথায় কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হবে সেটার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের কয়লাভিত্তিক এই কেন্দ্রটি চুক্তি অনুযায়ী ঠিক সময়ে উৎপাদনে আসবে বলেও আমরা আশাবাদী।’

জানা গেছে, প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে চীনের সরকারি কোম্পানি ‘পাওয়ার চায়না রিসোর্স লিমিটেড’ ও বাংলাদেশের ‘আইসোটেক ইলেকট্রিফিকেশন কোম্পানি লিমিটেড’। এই দুই কোম্পানি যৌথভাবে বরিশাল ইলেকট্রিফিকেশন কোম্পানি গঠন করেছে। আইসোটেক ইলেকট্রিফিকেশন হচ্ছে আইসোটেক গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। বরিশাল পাওয়ার কোম্পানি কেন্দ্রটির প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা (৫৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)। চুক্তি অনুযায়ী সরকারকে ২৫ বছর বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে প্রতিষ্ঠানটি। ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের মূল্য ধরা হয়েছে ৬.৭৭ টাকা (প্রতি টন কয়লার দর ১২০ ডলার হিসেবে)। কয়লার দাম কম থাকলে সেই অনুযায়ী বিদ্যুতের দাম কমে যাবে।

কেন্দ্রটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আইসোটেক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বরিশাল ইলেকট্রিফিকেশন কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট মঈনুল আলম এ প্রসঙ্গে সারাবাংলাকে জানান, চুক্তি অনুযায়ী ৪৫ মাসের মধ্যে কেন্দ্রটির নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে। এরইমধ্যে আমাদের ভূমি উন্নয়নের কাজ শেষ। এখন অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ শুরু হবে। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই এই কেন্দ্রের উৎপাদন শুরু হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, বিআইডাব্লিউটিএ ও স্থানীয় প্রশাসন প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে।’

গত শুক্রবার (৫ জুলাই) বরগুনার তালতলীতে সরেজমিন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নে এই কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হচ্ছে। পায়রা নদীর পাড়ে নির্মিতব্য এই কেন্দ্রটির ভূমি উন্নয়নের কাজ প্রায় শেষের দিকে। বুলডোজার দিয়ে এখন মাটি সমান করার কাজ চলছে। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় পাইলিং করার মাধ্যমে অবকাঠামোগত কাজ করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ভরাট করা জমিতে হ্যামার দিয়ে কমপ্যাক্ট নিশ্চিত করার জন্য পানি শুষে নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশিদের পাশাপাশি চায়না কোম্পানির লোকজনও কাজ করছে প্রকল্প এলাকায়।

প্রকল্পের ভূমি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন জানান, দীর্ঘমেয়াদী এই কেন্দ্রটির জন্য আড়াইশ একর জায়গা দরকার। আপাতত ৩৫০ মেগাওয়াটের জন্য দেড়শ একর জমির প্রয়োজন। এর বিপরীতে আমরা এরইমধ্যে দুইশ একর জায়গার উন্নয়ন কাজ শেষ করে ফেলেছি। আর ৫০ একর জায়গা বন্দোবস্তের প্রক্রিয়া চলছে। তিনি জানান, আগামী মাসে ডরমেটরি নির্মাণসহ অন্যান্য সিভিল ওয়ার্ক শুরু হবে। তখন একসঙ্গে মূল পাওয়ার প্লান্টের কাজও শুরু হবে।
এই কর্মকর্তা আরও জানান, কেন্দ্রটির জায়গা বন্দোবস্ত দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় আগে অনেকেই বসবাস করতো। এরকম বসবাসকারী ১৪২টি পরিবারকে আমরা কোম্পানির পক্ষ থেকে জায়গা কিনে দিয়ে স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। প্রকল্প এলাকা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে এসব পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। পুনর্বাসন করা স্থানটির এখনও কোনো নাম না দিলেও আইসোটেক পাড়া নামকরণের চিন্তা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কেন্দ্রটি পুরোদমে চালু হলে তিন থেকে চার হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। এরই মধ্যে মাটি ভরাট ও জায়গা উন্নয়নে স্থানীয়রা কাজ করছেন। এছাড়া, প্রকল্প এলাকায় স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও স্থানীয়দের জন্য গভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বরগুনা জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ এ প্রসঙ্গে সারাবাংলাকে বলেন, এই কেন্দ্রটি সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প। কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি হলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যাবে। আমরা চাই সকল নিয়ম মেনে কেন্দ্রটি হোক। পরিবেশের জন্য কয়লাভিত্তিক এই কেন্দ্রটি ক্ষতির কারণ হবে কি না জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রকল্পের লোকজন আমাদেরকে নিশ্চিত করেছেন পরিবেশের ক্ষতি হবে এমন কোনো কাজ তারা করবেন না। এছাড়া, পরিবেশ অধিদপ্তর কেন্দ্রটিকে ছাড়পত্র দিয়েছে। পাশাপাশি আমরাও এ বিষয়ে সজাগ রয়েছি।
উল্লেখ্য, পাওয়ার চায়না রিসোর্স লিমিটেড কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশ্বের প্রথম সারির একটি প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটি ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, কম্বোডিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
সারাবাংলা/এইচএ/জেএএম