Friday 21 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

রেমিট্যান্সে ভর করে বৈদেশিক খাতে ফিরছে স্বস্তি

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৬ জুলাই ২০২৬ ২০:১৯ | আপডেট: ৬ জুলাই ২০২৬ ২২:২৪

ঢাকা: বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতার ধারা আরও শক্তিশালী হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। একই সময়ে লেনদেন ভারসাম্যে (ব্যালেন্স অব পেমেন্টস-বিওপি) বড় উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ কমেছে। এর সুযোগে বাজার থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডলার কিনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও মাসের মাঝামাঝি এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (এসিইউ) আমদানি বিল পরিশোধে রিজার্ভে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছিল, তবে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ‘এক্সচেঞ্জ রেট অ্যান্ড ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট ডায়নামিকস: মে ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের এই ইতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসজুড়ে আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় স্থির ছিল। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত রেফারেন্স বিনিময় হার ১২২ দশমিক ৭৪ থেকে ১২২ দশমিক ৯৮ টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছে। অর্থাৎ পুরো মাসে ডলারের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যায়নি। ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের কাছে ডলার বিক্রির হার কিছুটা পরিবর্তিত হলেও রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের ডলার কেনার হার প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। এতে বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য, চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারাবাহিক বৃদ্ধি, চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে আসা এবং আর্থিক হিসাবে বড় উদ্বৃত্ত তৈরি হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বেড়েছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করে অতিরিক্ত ডলার কিনতে সক্ষম হয়েছে। মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছে, যা এপ্রিল মাসে ছিল ১৮০ মিলিয়ন ডলার। এক মাসের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনা প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেড়েছে।

তবে মে মাসে রিজার্ভের ওপর একটি বড় চাপও আসে। ১০ মে এসিইউর মাধ্যমে মার্চ-এপ্রিল সময়ের আমদানি বিল পরিশোধে প্রায় ১ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়। এর ফলে মাসের মাঝামাঝি রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পরে রেমিট্যান্স ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ায় রিজার্ভ আবার বাড়তে শুরু করে। সব মিলিয়ে মে মাস শেষে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এপ্রিলের তুলনায় প্রায় ৫৩০ মিলিয়ন ডলার কম ছিল।

প্রতিবেদন বলছে, মে মাসে আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে লেনদেনের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দৈনিক গড় স্পট লেনদেন এপ্রিলের ৩২ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে মে মাসে ৬৩ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে সোয়াপ লেনদেন ৯১ দশমিক ২৬ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭০ দশমিক ৫ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। ফলে মোট আন্তঃব্যাংক লেনদেনে স্পট লেনদেনের অংশ ২৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৭ দশমিক ৪০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এটি বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে তারল্য বৃদ্ধির একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মে মাসে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বিনিময় হারের ওঠানামা আগের মাসগুলোর তুলনায় কম ছিল। মার্চে কিছুটা চাপ তৈরি হলেও এপ্রিল ও মে মাসে সেই অস্থিরতা অনেকটাই কমে আসে। আন্তঃব্যাংক বাজারে বিনিময় হার পুরো মাস স্থির থাকায় বাজারে আস্থা আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এক বছর আগের তুলনায় মে মাসে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে মাত্র ০ দশমিক ২৪ শতাংশ। এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের তুলনায় এই অবমূল্যায়ন অনেক কম। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মুদ্রার অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের তুলনায় বেশি হয়েছে। আবার মে মাসে বাংলাদেশের নমিনাল ইফেকটিভ এক্সচেঞ্জ রেট (এনইইআর) কিছুটা বেড়েছে, যা প্রধান বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর মুদ্রার তুলনায় টাকার অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে রিয়েল ইফেকটিভ এক্সচেঞ্জ রেট (আরইইআর) সূচকও বেড়েছে।

প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক খাত আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। জুলাই-এপ্রিল সময়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে ১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। যদিও বাণিজ্য ঘাটতি এখনো বড়, তবে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ সেই চাপ অনেকটাই সামাল দিচ্ছে। একই সঙ্গে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকায় সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যও উদ্বৃত্তে রয়েছে।

তবে রফতানি খাতে কিছুটা দুর্বলতা রয়ে গেছে। জুলাই-এপ্রিল সময়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ১ দশমিক ১ শতাংশ, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। তৈরি পোশাক রপ্তানির গতি কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। অন্যদিকে একই সময়ে আমদানি বেড়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ। জ্বালানি, সার ও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে।

অন্যদিকে বৈদেশিক খাতের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হিসেবে রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারাবাহিক বৃদ্ধিকে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে দেশে ২৯ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, প্রবাসী আয় এখন দেশের বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। রেমিট্যান্সের এই প্রবৃদ্ধি, স্থিতিশীল বিনিময় হার এবং লেনদেন ভারসাম্যের উদ্বৃত্ত আগামী মাসগুলোতেও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে প্রতিবেদনে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

সারাবাংলা/এসএ/এসআর
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর