Saturday 16 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ডিসিসিআই’র ঢাকাভিত্তিক ত্রৈমাসিক ইপিআই স্কোর চালু

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৬ মে ২০২৬ ১৫:১৩

– ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: দেশের বেসরকারি খাতের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবস্থা ও গতি-প্রকৃতি পরিমাপে নতুন একটি সূচক চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। ‘ইকোনমিক পজিশন ইনডেক্স’ (ইপিআই) নামে এই সূচকের মাধ্যমে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে অর্থনীতির গতি, বিশেষ করে বেসরকারি খাতের কার্যক্রম, উৎপাদন ও সেবাখাতের অবস্থান মূল্যায়ন করা হবে। ব্যবসায়িক সংগঠনটির মতে, প্রচলিত জিডিপি বা অন্যান্য সূচক দিয়ে অর্থনীতির তাৎক্ষণিক ও বাস্তব চিত্র বোঝা যায় না। সে ঘাটতি পূরণে নতুন এ প্রক্সি সূচক তৈরি করা হয়েছে।

শ‌নিবার (১৬ মে) ডিসিসিআই আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক (ইপিআই): বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ত্রৈমাসিক অবস্থার মূল্যায়ন’ শীর্ষক এক সেমিনারে এ তথ্য ত‌ুলে ধরা হয়। সে‌মিনা‌রে স্বাগত বক্তব্য রা‌খেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ। মূল প্রবন্ধে উপস্থাপন ক‌রেন ডিসিসিআই মহাসচিব (ভারপ্রাপ্ত) ড. একেএম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারি।

বিজ্ঞাপন

গবেষণাটি আপাতত ঢাকা কেন্দ্রিক। কারণ, দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৪৬ শতাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম থেকে আসে। গবেষণায় কৃষি, উৎপাদন ও সেবা—এই তিন প্রধান খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গবেষণায় মোট ৭৬২টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উৎপাদন খাতের প্রতিষ্ঠান ছিল ৩৩০টি এবং সেবাখাতের প্রতিষ্ঠান ছিল ৪৩২টি। জরিপ পরিচালিত হয় ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
ভবিষ্যতে গবেষণা কার্যক্রমটি সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হবে বলে ডিসিসিআই জানায়।

গবেষণার ফল অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ঢাকা কেন্দ্রিক অর্থনীতিতে ইপিআই স্কোর দাঁড়িয়েছে ০.৫০। এটি অর্থনীতিতে ‘মডারেট ইমপ্রুভমেন্ট’ বা মাঝারি ধরনের উন্নতির ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, আগের স্থবিরতা কাটিয়ে অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় ৯০ শতাংশই বেসরকারি খাতনির্ভর। কিন্তু এই খাতের ‘হেলথ কন্ডিশন’ বা বাস্তব অবস্থা বোঝার মতো কার্যকর কোনো সূচক দেশে নেই। প্রচলিত জিডিপি হিসাব বছরে একবার প্রকাশ হয় এবং তা পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ফলে নীতিনির্ধারণে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

ড. একেএম আসাদুজ্জামান পটোয়ারি বলেন, বিশ্বব্যাপী আগে ‘ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্স’, ‘হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স’ (এইচডিআই), ‘মাল্টিডাইমেনশনাল পোভার্টি ইনডেক্স’সহ বিভিন্ন সূচক ব্যবহৃত হলেও সেগুলো অর্থনীতির সামগ্রিক স্বাস্থ্য বা বেসরকারি খাতের গতিশীলতা পুরোপুরি প্রতিফলিত করতে পারেনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

তিনি বলেন, ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে জিডিপি ছিল বার্ষিক পরিমাপভিত্তিক। পরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নের পরামর্শ দেয়। তবে বিদ্যমান তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও সময়মতো ডেটা না পাওয়ার কারণে বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় একটি ‘প্রেডিক্টেবল অ্যানালিটিক্যাল প্রক্সি’ তৈরির প্রয়োজনীয়তা থেকেই ইপিআই সূচকের ধারণা আসে।

তি‌নি জানান, প্রথম প্রান্তিক থেকে দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্যবসার উৎপাদন, বিক্রি, মুনাফা ও কার্যক্রমে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, সেটিই মূলত যাচাই করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বা মুনাফা বেড়ে গেলে সেটিকে ‘১’ এবং কমে গেলে ‘০’ ধরে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পরে বিভিন্ন খাতের জিডিপি অবদান অনুযায়ী ওজন (ওয়েট) নির্ধারণ করে সামগ্রিক স্কোর তৈরি করা হয়।

গবেষণায় কৃষি খাতের স্কোর এসেছে ০.৮০, যা সবচেয়ে ভালো। যা কৃষিতে শক্তিশালী ও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। এ খাতে ফসল ও উদ্যান তত্ত্ব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপখাত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অন্যদিকে উৎপাদন খাতের স্কোর মাত্র ০.৩৩। গবেষকদের ভাষায়, এটি অত্যন্ত দুর্বল অবস্থার প্রতিফলন। শিল্পকারখানার কার্যক্রমে এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরেনি। বিশেষ করে টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, চামড়া, প্লাস্টিক, ওষুধ ও ধাতব খাতকে বিশ্লেষণে নেওয়া হয়।

সেবাখাতের স্কোর এসেছে ০.৪৭। এই খাতে মাঝারি ধরনের উন্নতির চিত্র পাওয়া গেছে। খুচরা বাণিজ্য, রিয়েল এস্টেট, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যাংক ও আর্থিক সেবা খাতকে বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গবেষণা উপস্থাপনায় বলা হয়, ২০২৫ সালের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার পর অর্থনীতি এক ধরনের স্থবিরতায় ছিল। তবে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিক থেকে পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হয়েছে। ইপিআই স্কোর ০.৫০ সেই পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গবেষকদের ভাষায়, “ইকোনমি স্টার্টেড টু রিকভার, ইকোনমি স্টার্টেড টু ব্যাক অন টু দ্য ট্র্যাক।”

গ‌বেষক‌দের মতে, সরকারের বাজেট, মুদ্রানীতি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতির কার্যকারিতা মূল্যায়নে ত্রৈমাসিক ভিত্তিক এমন সূচক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি খাত কোথায় সমস্যায় পড়ছে বা কোথায় নীতিগত সংশোধন দরকার, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

গবেষণায় আরও বলা হয়, বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন সূচক—যেমন ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই), শিল্প উৎপাদন সূচক বা মজুরি সূচক—আলাদাভাবে কিছু তথ্য দিলেও অর্থনীতির সামগ্রিক বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে পারে না। তাই বেসরকারি খাতের ‘অর্থনৈতিক পালস’ বোঝার জন্য সমন্বিত ও তথ্যনির্ভর নতুন সূচক প্রয়োজন।