সিরাজগঞ্জ: আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের অন্যতম বৃহৎ গবাদিপশু উৎপাদনকারী জেলা সিরাজগঞ্জ জুড়ে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারিরা। জেলার ৯টি উপজেলায় ছোট-বড় হাজারো খামারে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে কোরবানির পশু বিক্রিকে কেন্দ্র করে। খামারে খামারে চলছে গরু-ছাগলের পরিচর্যা, খাবার সরবরাহ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা। দীর্ঘ এক বছরের শ্রম, বিনিয়োগ আর স্বপ্ন এখন নির্ভর করছে ঈদের হাটের ওপর।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৭ হাজার ৭২৩টি। এর মধ্যে স্থানীয় চাহিদা রয়েছে মাত্র ২ লাখ ৯৩ হাজার ৬৭৬টি। অর্থাৎ চাহিদা পূরণ করেও জেলায় উদ্বৃত্ত থাকছে ৩ লাখ ২৪ হাজার ৪৭টি পশু। এসব পশু রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কোরবানির বাজারে সরবরাহ করা হবে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, মোট পশুর মধ্যে গরুর সংখ্যা ১ লাখ ৯৯ হাজার ৯২৪টি, ছাগল ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০টি এবং ভেড়ার সংখ্যা ৪৭ হাজার ৭২৪টি। জেলার শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া ও সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি পশু উৎপাদিত হয়েছে। ফলে ঈদকে ঘিরে এসব এলাকায় এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুতের খরচ ও শ্রমিক ব্যয়ের চাপ বাড়লেও তারা এবারও আশাবাদী। অনেকেই ব্যাংক ঋণ কিংবা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে খামার পরিচালনা করছেন। তবে তাদের প্রত্যাশা, সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশ না করলে দেশীয় খামারিরা ভালো দাম পাবেন এবং লোকসানের শঙ্কা কাটবে।
ছোঁয়া মনি ডেইরী ফার্মের মালিক হাজী আব্দুস সাত্তার বলেন, আমরা সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে গরু পালন করেছি। কোনো ধরনের ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার করা হয়নি। খামারে প্রতিটি পশুর স্বাস্থ্য নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়েছে। ক্রেতারা খামারে এসে গরু দেখে সন্তুষ্ট হচ্ছেন। এখন শুধু ভালো দামের অপেক্ষায় আছি। গত কয়েক বছরে ভারতীয় গরু আসায় দেশীয় খামারিরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। এবার যদি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে খামারিরা কিছুটা হলেও লাভবান হবেন।
শাহজাদপুর উপজেলার খামারি মো. শফিকুল ইসলাম জানান, একটি গরু পালন করতে এখন আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ খরচ হচ্ছে। গো-খাদ্য, ওষুধ ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় অনেক খামারি চাপে রয়েছেন। তারপরও কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে তারা নতুন আশা নিয়ে কাজ করছেন। একটা গরু এক বছর ধরে লালন-পালন করতে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। খাবারের দাম অনেক বেশি। বাজারে যদি ন্যায্য মূল্য না পাই, তাহলে খামার টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।
উল্লাপাড়ার আরেক খামারি সেলিম রেজা বলেন, আমাদের গরুগুলো দেশীয় খাবারে বড় করা হয়েছে। এখন ক্রেতারা সচেতন হচ্ছেন। তারা ভালো ও স্বাস্থ্যসম্মত পশু কিনতে চান। আশা করছি এবার বাজার ভালো হবে।
এদিকে নিরাপদ মাংস উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রাণিসম্পদ বিভাগও ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। জেলার ৩৭টি স্থায়ী ও অস্থায়ী পশুর হাটে মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিম পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অসুস্থ পশু শনাক্তকরণ এবং অবৈধ ওষুধ ব্যবহারের বিরুদ্ধে নজরদারি করবে।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ, কর্মকর্তা ডা. এ.কে.এম আনোয়ারুল হক বলেন, ‘সিরাজগঞ্জে এবার পর্যাপ্ত কোরবানির পশু প্রস্তুত রয়েছে। জেলার চাহিদা পূরণ করেও বিপুলসংখ্যক পশু দেশের অন্যান্য জেলায় সরবরাহ করা যাবে। আমরা খামারগুলো নিয়মিত মনিটরিং করছি যাতে কোনো খামারি ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার না করেন। প্রতিটি পশুর হাটে মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ক্রেতারা যেন সুস্থ ও নিরাপদ পশু কিনতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি।’
জেলা প্রাণিসম্পদ দফতরের কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিরাজগঞ্জে বাণিজ্যিক খামারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক শিক্ষিত যুবক বেকারত্ব দূর করতে গবাদিপশুর খামারে যুক্ত হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এই জেলা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কোরবানির পশুকেন্দ্রিক অর্থনীতি এখন গ্রামীণ অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। খামার, পশু পরিবহন, খাদ্য উৎপাদন, হাট ব্যবস্থাপনা ও শ্রমবাজার সবখানেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জের মতো জেলাগুলো দেশের কোরবানির পশুর বড় জোগানদাতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে খামারিদের শঙ্কাও কম নয়। অনেকেই বলছেন, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং পরিবহন খরচ বাড়লে তারা কাঙ্ক্ষিত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তাই সরকারিভাবে হাট ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জে এখন কোরবানির পশু নিয়ে আশাবাদ আর উদ্বেগ দুই চিত্রই দেখা যাচ্ছে। বছরের পর বছর পরিশ্রমে গড়ে ওঠা খামারগুলোর ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এবারের বাজার পরিস্থিতির ওপর। খামারিদের প্রত্যাশা, নির্বিঘ্নে পশু হাটে তুলতে পারলে এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হলে এবারের ঈদ তাদের মুখে হাসি ফোটাবে।