সিলেট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য বিএনপি ৩৬ জনের নামের তালিকা ঘোষণা করেছে। এই তালিকায় রয়েছেন মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত এবাদুর রহমান চৌধুরীর কন্যা ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী। তবে তিনি কেবল ‘পারিবারিক ঐতিহ্যে’ নয়, বরং নিজের বর্ণাঢ্য শিক্ষা ও কর্মজীবন দিয়ে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বাবার আদর্শ ধরে রাখতে এবার সংরক্ষিত আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে চমক লাগিয়েছেন তিনি।
দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এই ‘ব্যালেন্সড’ সিদ্ধান্তে উজ্জীবিত মৌলভীবাজারের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। সিলেট জেলার একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থীদের ভিড় ঠেলে তার এই মনোনয়ন বিজয়ে প্রমাণ করে—সিলেটে বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসছে।
যে কারণে আলাদা জহরত আদিব চৌধুরী
ব্যারিস্টার জহরত আদিবের শিক্ষাজীবনের গ্রাফ যেকোনো মেধাবীর জন্য অনুপ্রেরণা। তিনি লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী লিংকনস্ ইন থেকে ব্যারিস্টারি ডিগ্রি (বার-অ্যাট-ল) অর্জন করেছেন। উচ্চতর শিক্ষার নেশায় তিনি পাড়ি জমিয়েছেন বিশ্বসেরা হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে। যেখান থেকে তিনি সিনিয়র এক্সিকিউটিভ লিডারশিপ প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেন। এ ছাড়া, যুক্তরাজ্যের ডার্বি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যিক আইনে এলএলএম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে অ্যাডভান্সড সার্টিফিকেট ইন বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অর্জন করেছেন।
কর্মজীবন
রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে জহরত আদিব ছিলেন দেশের করপোরেট জগতের পরিচিত মুখ। তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ টেলিকম প্রতিষ্ঠান বাংলালিংক’র ডেপুটি সিইও এবং চিফ লিগ্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। উল্লেখ্য, তিনিই বাংলাদেশের টেলিকম ইন্ডাস্ট্রির প্রথম নারী ডেপুটি সিইও হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন। এর আগে তিনি গ্রামীণফোন এবং নোভার্টিসের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন।

সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য বিএনপির মনোনয়নে পেয়েছেন জহরত আদিব চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত
পারিবারিক ঐতিহ্য ও আদর্শ
জহরত আদিব চৌধুরীর রক্তে মিশে আছে রাজনীতি। তার পিতা অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরী ছিলেন মৌলভীবাজারের গণমানুষের নেতা। পিতার সেই আদর্শ এবং বড়লেখা-জুড়ীর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি আজ রাজনীতির ময়দানে। তার শ্বশুর ব্যারিস্টার মো. হায়দার আলী ছিলেন সাবেক সচিব এবং বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা। তার স্বামী ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জিশান হায়দার বর্তমানে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে আইন পেশায় যুক্ত আছেন।
সামাজিক ও আন্তর্জাতিক পরিচয়
পেশাগত কাজের প্রয়োজনে জহরত আদিব বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন এবং মৌলভীবাজার বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। এ ছাড়া, তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষামূলক ট্রাস্টের মাধ্যমে জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
রাজনীতির নতুন মিশন
জহরত আদিব সবসময় বিশ্বাস করেন নিজের যোগ্যতায় পৃথিবীকে বদলানো যায়। তবে বড়লেখা ও জুড়ীর মাটির সঙ্গে তার বাবার যে গভীর সম্পর্ক ছিল, সেই টান এড়িয়ে যেতে পারেননি। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘বাবার মতোই সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বড়লেখা-জুড়ীসহ পুরো মৌলভীবাজারের মানুষের সেবা করাই আমার একমাত্র লক্ষ্য।’ বাবার অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করতেই আমি রাজনীতির মাঠে।

মরহুম পিতা অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে জহরত আদিব চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত
বিএনপি দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি সংসদে মেধা ও যুক্তির লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে তারেক রহমান জহরত আদিবের মতো উচ্চশিক্ষিত ও আন্তর্জাতিকমানের পেশাদারদের প্রাধান্য দিয়েছেন। স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ মনে করছেন, তার মতো একজন শিক্ষিত ও দূরদর্শী নেতৃত্ব জাতীয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বকে আরও শক্তিশালী করবে।
এদিকে, সিলেট বিভাগের দুই জেলা হবিগঞ্জ থেকে শাম্মী আক্তার এবং মৌলভীবাজার থেকে জহরত আদিব চৌধুরীর এই মনোনয়ন সিলেট বিভাগের নারী নেতৃত্বে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। হেভিওয়েট একাধিক প্রার্থীরা বাদ পড়লেও ত্যাগী ও মেধাবী উত্তরসূরিদের এই মূল্যায়ন আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে।
উল্লেখ্য, সিলেট বিভাগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে আরও হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন— ব্যারিস্টার সামিরা তানজিন চৌধুরী, সৈয়দা আদিবা হোসেন, তাহসিন শারমিন তামান্না, ফাহিমা আহাদ কুমকুম, ছাবিনা খান পপি, ছালমা আক্তার, নিহার সুলতানা তিথী, বীথিকা বিনতে হোসাইন, অ্যাডভোকেট তহমীনা আক্তার হাসেমী, অ্যাডভোকেট মুন্নী খানম (হাদিয়া চৌধুরী মুন্নি) ও মুনমুন তালুকদার। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত তারা মনোনয়ন তালিকায় জায়গা করে নিতে পারেননি।