Sunday 19 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জুলাইয়ের দিনলিপি / কমপ্লিট শাটডাউনে ঝরল শিশু রিয়া গোপসহ ৬৭ প্রাণ

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১৯ জুলাই ২০২৬ ০৮:২২ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ ১০:৩২

জুলাইয়ের দিনলিপি। ফাইল ছবি

ঢাকা: ১৯ জুলাই ২০২৪। দিনটি একটি সাধারণ শুক্রবার হওয়ার কথা ছিল । কিন্তু বাতাসের ভারী হয়ে আসা ও গুমোট উত্তেজনা জানান দিচ্ছিল, বাংলাদেশের ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে আরও একটি রক্তাক্ত অধ্যায়। এদিন তরতাজা প্রাণের বিনিময়ে নতুন এক গণজাগরণের অগ্নিগর্ভ ও রক্তাক্ত জন্মদিনের সূচনা। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ততক্ষণে আর কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আটকে নেই, তা রূপ নিয়েছে সর্বাত্মক জাতীয় প্রতিরোধে। সাধারণ ছাত্র-জনতার ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে টেকনাফ-তেঁতুলিয়া-গোটা দেশ যেন পরিণত হয়েছিল এক রণক্ষেত্রে। আকাশে চক্কর কাটছে হেলিকপ্টার, আর পিচঢালা রাজপথে লুটিয়ে পড়ছে একের পর এক নিথর দেহ।

বিজ্ঞাপন

ভোর থেকেই রণক্ষেত্র ও দেশজুড়ে তুমুল প্রতিরোধ

শুক্রবার ছুটির দিনের সকালে যেখানে সুনসান নীরবতা থাকার কথা, সেখানে সকাল থেকেই রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। বেলা ১১টা বাজতেই রাজধানীর রামপুরা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। মুহূর্তের মধ্যে সেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, উত্তরা ও মহাখালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে। শুধু রাজধানীই নয়, আন্দোলনের এই দাবানল গ্রাস করে ঢাকার বাইরের খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট, রংপুর, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও গাজীপুরকে। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, নরসিংদী জেলা কারাগারে অতর্কিত হামলা চালিয়ে, কর্মকর্তাদের জিম্মি করে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটে এদিন।

প্রতীকী টার্গেট ও ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা

বিক্ষুব্ধ জনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও দমন ব্যবস্থার প্রতীকের ওপর। আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ি, রামপুরা থানা ও মিরপুরের পাঁচটি পুলিশ বক্সে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ ছাড়াও বনানীতে বিআরটিএ-এর সদর কার্যালয়, মিরপুরের মেট্রো-১ কার্যালয় এবং মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো ভবনে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় ডিএমপি ঢাকায় মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে যোগাযোগ খাতে; মিরপুর-১০ নম্বর কাজীপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনে ব্যাপক ভাঙচুর চালানোর পর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায় মেট্রোরেল। রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল এবং আন্তর্জাতিক বেশ কিছু ফ্লাইটও বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতালগুলোতে লাশের মিছিল ও রক্তের হাহাকার

১৯ জুলাইয়ের সেই ভয়াবহ দিনে ঠিক কতজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি তথ্যে বিভ্রান্তি ছিল। তবে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এদিন সারাদেশে অন্তত ৬৭ জন মানুষ গুলিতে নিহত হন, যার মধ্যে শুধু ঢাকাতেই প্রাণ হারান ৬২ জন। কোনো কোনো গণমাধ্যমের মতে, ঢাকার বাইরে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১২। এই সহিংসতায় গুলিবিদ্ধ হন বিডিনিউজ ট্রিপল নাইনের সাংবাদিক আল মামুনসহ শিক্ষার্থী, পথচারী ও রাজনৈতিক কর্মীসহ শত শত মানুষ। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে তখন তিল ধারণের জায়গা ছিল না, জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের সিংহভাগই ছিলেন চোখ, বুক ও মাথায় গুলিবিদ্ধ। হাসপাতালগুলোতে রক্তের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় চিকিৎসকদের হাহাকার করতে দেখা গেছে, আর এই বিপুল চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন নার্স ও চিকিৎসকেরা।

নিভে যাওয়া কিছু নিষ্পাপ প্রদীপ

এই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের সবচেয়ে নির্মম শিকার হয়েছিল কিছু অবুঝ শিশু ও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে তীব্র সংঘর্ষের মধ্যে বাবার হাত ধরে থাকা অবস্থায় মাত্র সাত বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্র আহাদুন নবীর বুকে সরাসরি বুলেট এসে লাগে। বাবার কোলেই নিথর হয়ে যায় ছোট্ট আহাদ। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের নয়ামাটি এলাকায় চারতলার ছাদে কৌতূহলবশত গিয়ে পুলিশের গুলিতে মাথায় আঘাত পায় ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপ। বাবা দীপক কুমার গোপ তাকে কোলে তুলে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার আগেই ছিটকে আসে সেই বুলেট; পাঁচ দিন আইসিইউতে লড়ে চিরতরে চোখ বোজে রিয়া। বাড্ডায় আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে মারা যান সাধারণ রিকশাচালক সৈয়দ মোস্তফা আলী বাবলু। একই এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ২৭ জুলাই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তরুণ পোশাক শ্রমিক মো. ইয়ামিন চৌধুরী।

বেঁচে থাকার আকুতি ও পঙ্গুত্বের নির্মম বাস্তবতা

যারা প্রাণ হারাননি, তাদের অনেকের জীবনই চিরদিনের জন্য থমকে গেছে পঙ্গুত্বের নির্মম যাতনায়। ঢাকার সাভারে কারফিউ জারির ঠিক আগের মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে পায়ে গুলি লাগে সাধারণ রিকশাচালক মো. রাসেল আহমেদের। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও হাড় গুঁড়ো হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার ডান পাটি কেটে বাদ দিতে বাধ্য হন। মিরপুর এলাকায় আন্দোলনের সময় খুব কাছ থেকে ছররা গুলির শিকার হন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ফারহান, যার মুখমণ্ডল, ঠোঁট ও নাকের একাংশ সম্পূর্ণ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। রামপুরা-বনশ্রী এলাকায় বাসার নিচে থাকা অবস্থায় সাউন্ড গ্রেনেডের স্প্লিন্টারে চোয়াল ভেঙে মুখমণ্ডল স্থায়ীভাবে বিকৃত হয়ে যায় ১২ বছরের শিশু ফাহিমের।

অভিভাবক সমাজের সংহতি ও ৯ দফার ডাক

নিপীড়নের এই চরম মুহূর্তে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কিন্তু একা ছিলেন না। সন্তানের ওপর এমন নির্বিচার গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ‘সন্তানের পাশে অভিভাবক’ ব্যানারে সর্বস্তরের অভিভাবক সমাজ রাজধানীর শাহবাগে এক অনন্য মানববন্ধনের ডাক দেন। রাজপথে সাধারণ মানুষ নিজেদের সাধ্যমতো আন্দোলনকারীদের মাঝে শুকনা খাবার, পানি ও খাবার স্যালাইন বিতরণ করতে থাকেন। সরকারের পক্ষ থেকে ওবায়দুল কাদের একে ‘বিএনপি-জামায়াতের নৈরাজ্য’ আখ্যা দিয়ে ছাত্রলীগকে ইঙ্গিত করে প্রতিরোধের ডাক দিলেও, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সরকারের সংলাপের প্রস্তাব পূর্ণাঙ্গভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তারা কমপ্লিট শাটডাউন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে নতুন করে ৯ দফা দাবি পেশ করে।

মধ্যরাতে আটক হন নাহিদ ইসলাম, কারফিউ ও সেনা মোতায়েন

দিনভর রক্তগঙ্গা পেরিয়ে রাত যত গভীর হচ্ছিল, রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ততটাই কঠোর রূপ নিচ্ছিল। রামপুরার দিকে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়ার দৃশ্য দেখে হাজারো মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও, র‍্যাবের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তারা কেবল আকাশ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও উদ্ধার কাজ চালিয়েছেন। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় রাতে গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি, বিজিবির ডিজি ও ডিএমপি কমিশনার। ফলে ১৯ জুলাই শুক্রবার রাত ১২টা থেকে সারা দেশে জারি করা হয় কড়া কারফিউ এবং নামানো হয় সেনাবাহিনী। আর সেই গভীর রাতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম।

একটি নতুন ইতিহাসের সূচনা

কারফিউর সাইরেন আর বুটের শব্দে যখন গ্রাস করছিল নিস্তব্ধ মধ্যরাত, তখনো হাসপাতালের মর্গে পড়ে ছিল স্তূপীকৃত মরদেহ, আর বাতাসে ভাসছিল স্বজনহারা মায়েদের বুকফাটা আর্তনাদ। ১৯ জুলাইয়ের এই রক্তস্নাত অধ্যায় স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, এটি আর কেবল সরকারি চাকরির কোটা পরিবর্তনের সাধারণ কোনো লড়াই ছিল না। এটি ছিল দমনপীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অধিকার আর ন্যায়ের দাবিতে বুক পেতে দেওয়ার এক ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্ট, যা বাংলাদেশের বুকে লিখে গেছে প্রতিরোধের এক নতুন ও অভূতপূর্ব মহাকাব্য।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর