Saturday 18 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জুলাইয়ের দিনলিপি / ‘কমপ্লিট শাটডাউন’র দিনে ইন্টারনেট বন্ধ, মুগ্ধ, ইয়ামিন ও শিশু সামিরসহ সারাদেশে নিহত ৩১

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১৮ জুলাই ২০২৬ ০৮:৩৪ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ ০৮:৪০

ঢাকা: সেদিন সকালের সূর্যটা আর দশটা দিনের মতোই উঠেছিল। কিন্তু ঢাকার আকাশে বাতাসের গন্ধটা ছিল অন্যরকম । বারুদ, টিয়ারশেল আর খাঁ খাঁ রোদের তীব্রতা মিলেমিশে একাকার। দুপুরের পর থেকেই দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। রাজপথের পিচ গলে যাওয়ার বদলে গলতে শুরু করে তাজা রক্ত। ১৮ জুলাই ২০২৪ । বাঙালির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব এবং রক্তনদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রতিরোধের দিন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুরো দেশ রূপ নিয়েছিল এক অবরুদ্ধ রণক্ষেত্রে। একদিকে বুলেটের গর্জন, অন্যদিকে তরুণ প্রাণের চিৎকার; আর এই সবকিছুর মাঝে হঠাৎ করেই ধেয়ে এলো এক অদ্ভুত অন্ধকার। রাত ৯টার পর বন্ধ হয়ে গেল ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট। দেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল পুরো পৃথিবী থেকে, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় লাল অক্ষরে লেখা হয়ে গেল এক নতুন মহাকাব্য।

বিজ্ঞাপন

রক্তে ভেজা রাজপথ ও বুলেটের মুখে দাঁড়ানো তরুণরা

ঢাকার রামপুরা, মহাখালী, মিরপুর, মালিবাগ, বাড্ডা থেকে শুরু করে উত্তরা, প্রতিটি মোড় যেন একেকটি ফ্রন্টলাইন। সাভারে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (MIST) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী শাইখ আসহাবুল ইয়ামিন পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে সাঁজোয়া যান থেকে রাস্তায় ফেলে দেওয়ার নিষ্ঠুর দৃশ্য মানুষের হৃদয়ে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। একই দিন বিকেলে মিরপুর ১০ নম্বরের চারতলার বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে লাইট জ্বালানোর চেষ্টা করছিল ছয় বছরের শিশু সামির রহমান। কিন্তু ওপর থেকে র‍্যাবের হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া একটি বুলেট বারান্দার গ্রিল ফুটো করে তার চোখ দিয়ে মাথায় গিয়ে লাগে। ঘটনাস্থলেই নিথর হয়ে যায় সাউথ পয়েন্ট স্কুলের কেজির এই ছোট্ট ছাত্রটি।

শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রাম, নরসিংদী, রংপুরসহ দেশের অন্তত ৪৭টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছিল এই নজিরবিহীন প্রতিরোধ। বাড্ডা-রামপুরা এলাকায় ছররা গুলি ও টিয়ার শেলের আঘাতে কলেজ শিক্ষার্থী আরিফের এক হাতের কব্জি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা পরে কনুইয়ের নিচ থেকে কেটে ফেলতে বাধ্য হন চিকিৎসকেরা। রামপুরা ব্রিজের কাছে পুলিশের ছররা গুলিতে দুই চোখ ঝাঁঝরা হয়ে চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারান তরুণ চাকরিজীবী ইয়ামিন।

‘পানি লাগবে কারও?’ -মুগ্ধর চলে যাওয়া

উত্তরা আজমপুর এলাকার তীব্র সংঘাত আর টিয়ারশেলের ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় যখন আন্দোলনকারীরা দিশেহারা, তখন কাঁধে ব্যাগ আর দুই হাতে পানির বোতল নিয়ে অনবরত ছুটছিলেন এক তরুণ। তিনি মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও ফ্রিল্যান্সার। ক্লান্ত-তৃষ্ণার্ত শিক্ষার্থীদের চোখ ধোয়ানো আর তেষ্টা মেটাতে ফ্রন্টলাইনে গিয়ে তিনি চিৎকার করে বলছিলেন, ‘পানি লাগবে কারও? পানি? ফ্রি পানি!’ কিন্তু এই মানবিকতার পুরস্কার হিসেবে কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি বুলেট এসে লাগে তার কপালে। সঙ্গে থাকা পানির বোতলগুলো রাজপথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে, আর নিথর হয়ে যায় এক অদম্য প্রাণ। বন্ধুরা বহু চেষ্টা করেও পুলিশের বাধার কারণে তাকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিতে পারেননি। পরে ক্রিসেন্ট হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মুগ্ধর এই শেষ আকুতি আর আত্মত্যাগ পুরো জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় আবেগ ও চিরস্মরণীয় স্লিপিং ডল-এ পরিণত হয়।

‘আরেকটা মার!’ এবং রিকশাচালকের সেই ঐতিহাসিক স্যালুট

তীব্র বারুদের গন্ধ আর ভয়ার্ত পরিবেশের মাঝেও সেদিন জন্ম নিয়েছিল কিছু অকুতোভয় রূপকথা। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে যখন পুলিশের মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেড ফাটছিল, তখন এক ফুচকা বিক্রেতা তরুণ মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে বলছিলেন, ‘আরেকটা মার! আরেকটা মার!’ স্বৈরাচারের প্রতি এই চরম অবজ্ঞার দৃশ্য পরবর্তীতে গ্রাফিতির দেয়ালে দেয়ালে স্থান করে নেয়।

ঠিক একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও দোয়েল চত্বর এলাকায় যখন তীব্র সংঘর্ষ চলছিল, তখন নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে রিকশার সিটের ওপর দাঁড়িয়ে যান সাধারণ এক শ্রমজীবী সুজন খান। সামরিক কায়দায় তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে জানান এক দীর্ঘ স্যালুট। পরবর্তীতে সুজন খান বলেছিলেন, ছাত্রদের বুকে তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের রূপ দেখছিলেন। এই সাধারণ মানুষের সংহতি আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে।

অবরুদ্ধ ইন্টারনেট এবং অন্ধকারের চাদরে ঢাকা বাংলাদেশ

মোবাইল ইন্টারনেট আগে থেকেই বন্ধ ছিল, কিন্তু ১৮ জুলাই রাত ৯টার পর তৎকালীন সরকারের নির্দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তৎকালীন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহম্মেদ পলক একে ‘পরিস্থিতি বুঝে নেওয়া ব্যবস্থা’ বললেও, মূলত দেশের ভেতরের নৃশংসতার খবর যেন বাইরে না যেতে পারে, সেজন্যই এই বাকস্বাধীনতার কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। দেশের মানুষ যখন নিজ ঘরে বসে বাইরের কোনো খবর পাচ্ছিলেন না, ঠিক তখনই রাজপথে একের পর এক লাশ পড়ছিল। এদিন সারা দেশে সাংবাদিকসহ অন্তত ৩১ জন নিহত হন এবং আহত হন দেড় হাজারের বেশি মানুষ। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ হওয়া, সেতু ভবন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরে অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো ছিল মূলত দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক একটি বহিঃপ্রকাশ।

সংলাপের প্রস্তাব বনাম শহিদের রক্তের মর্যাদা

সারাদেশের এই উত্তাল পরিস্থিতি দেখে সেদিন সন্ধ্যায় জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি জানান, সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি এবং প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে তাকে ও শিক্ষামন্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছেন। কিন্তু রাজপথে ঝরে যাওয়া তাজা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো সমঝোতায় যেতে রাজি হননি সমন্বয়কেরা।
আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ফেসবুকে লেখেন, ‘গুলির সঙ্গে কোনো সংলাপ হয় না। এই রক্তের সঙ্গে বেইমানি করার থেকে আমার মৃত্যু শ্রেয়।’ আরেক সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট জানিয়ে দেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সহিংসতা চালিয়ে সরকারই এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তাই শহিদের রক্তের ওপর কোনো সংলাপ হবে না।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের শতাধিক নেতাকর্মী পদত্যাগ করেন। এ ছাড়া, দেশের বিভিন্ন জেলায় ছাত্রলীগের ২৪ জন নেতাকর্মী দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

রাজপথের আপসহীন লড়াই

শাটডাউন কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে শেষ হয় রক্তে ভেজা ১৮ জুলাইয়ের দিনটি। রাত বাড়ে, কিন্তু রাজপথের রক্তের দাগ মোছে না। ইন্টারনেটহীন, আলোহীন এক অবরুদ্ধ বাংলাদেশে সেদিন ঘরের ভেতরের মানুষগুলো ঘুমাতে পারেনি বুলেটের শব্দে আর স্বজন হারানোর আতঙ্কে। আর রাজপথে জেগে থাকা তরুণেরা জেনে গিয়েছিল, এই লড়াই আর থামার নয়। যে বুক বুলেটের সামনে একবার পেতে দেওয়া হয়েছে, সেখানে আর কোনো স্বৈরাচারের ভয় ডানা মেলতে পারে না। অন্ধকার কেটে ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষায় সেদিন নীরব কান্না আর অদম্য জেদ বুকে চেপে ঘুমিয়েছিল বাংলাদেশ।

সারাবাংলা/এফএন/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর