ঢাকা: দেশে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মতো অসংক্রামক রোগে ৭০-৭১ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়। বিশ্বব্যাপী এ হার ৭৪ শতাংশ। একই সঙ্গে দেশের ২০ শতাংশের বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, অতিরিক্ত চিনি-লবণ ও অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাত (প্রসেসড) খাবারের ব্যবহারকে এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলেছেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, ভোক্তার তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে বাংলাদেশে দ্রুত ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে লেবেলিং (এফওপিএল) বিষয়ক গণমাধ্যম প্রচারাভিযান’ শীর্ষক মিডিয়া অ্যাডভোকেসি কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ বলেন, বর্তমানে প্যাকেটজাত খাদ্যের মোড়কে পুষ্টি-সংক্রান্ত তথ্য জটিল ও অস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে সাধারণ ভোক্তারা সহজে তা বুঝতে পারেন না এবং অজান্তেই অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, প্যাকেটের সামনের অংশে সহজ ও স্পষ্ট সতর্কবার্তা থাকলে ভোক্তারা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, যা অকালমৃত্যু কমাতে এবং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কর্মশালায় গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস বলেন, দেশে অসংক্রামক রোগে ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। খাদ্যাভ্যাসে নিয়ন্ত্রণ আনতে পারলে এই মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তিনি বলেন, প্যাকেটজাত খাদ্যে ছোট অক্ষরের তথ্যের পরিবর্তে সহজবোধ্য সতর্কবার্তা বা ‘ওয়ার্নিং সাইন’ চালু করা প্রয়োজন। এতে ভোক্তারা সচেতনভাবে খাদ্য নির্বাচন করতে পারবেন এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও কম লবণ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপাদান ব্যবহার করতে উৎসাহিত হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এফওপিএল কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বাংলাদেশেও দ্রুত এ নীতিমালা বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার মো. মাহফুজুর রহমান মিলন বলেন, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ অনুযায়ী খাদ্যপণ্যের মোড়কে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে দেশে এখনো কার্যকরভাবে এ আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বর্তমানে মোড়কজাত খাদ্যের লেবেলিং সংক্রান্ত প্রবিধিমালা প্রণয়নের কাজ করছে। ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং চালু হলে ভোক্তার অধিকার আরও সুসংহত হবে এবং নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ড. আহমাদ খায়রুল আবরার বলেন, দেশে অসংক্রামক রোগে ৭১ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়, যার এক-তৃতীয়াংশ হৃদরোগে। খাদ্য নির্বাচনজনিত ভুলের কারণে এসব রোগে আক্রান্তদের ৫১ শতাংশই ৭০ বছরের আগেই মারা যাচ্ছেন। তিনি জানান, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের কারণে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। তার মতে, ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং চালু হলে ভোক্তারা স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য বেছে নিতে পারবেন এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও পণ্যের উপাদান আরও স্বাস্থ্যকর করতে বাধ্য হবে।
বাংলাভিশনের সিনিয়র নিউজ এডিটর আবু রুশদ মো. রুহুল আমিন বলেন, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু তথ্য প্রচার নয়, বরং তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন ও জনআলোচনা সৃষ্টি, অনুসন্ধানী সংবাদ, এবং ধারাবাহিক প্রচারের মাধ্যমে এফওপিএল বিষয়ে জনগণের কাছে সহজভাবে তুলে ধরা এবং নীতিগত বিষয়গুলোকে জবাবদিহিমূলক ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের প্রকল্প সমন্বয়কারী মাহবুবা রহমান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রস্তাবিত ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) বিধিমালা’র খসড়া বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনাধীন রয়েছে। নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার এই পর্যায়ে প্রমাণভিত্তিক গণমাধ্যম প্রচার এবং সব অংশীজনের সমন্বিত অ্যাডভোকেসি ইতিবাচক জনমত সৃষ্টি ও নীতিগত অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হতে পারে।
কর্মশালায় প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ, যুব প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
কর্মশালার শেষে অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশে কার্যকর ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং বাস্তবায়নে ইতিবাচক জনমত গড়ে তোলা এবং নীতিমালা প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে গণমাধ্যম, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।