Thursday 09 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রেকর্ড বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল / চট্টগ্রামে পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখ মানুষ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৯ জুলাই ২০২৬ ২৩:৫৯ | আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৬ ০০:০৮

টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম: টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, ও বাঁশখালী উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

কোথাও কোমর, কোথাও গলা সমান পানিতে তলিয়ে গেছে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের ঘের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। ভেসে গেছে ঘরের আসবাবপত্র, ধান-চাল ও গবাদিপশুর খাদ্য। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেক এলাকায় দেখা দিয়েছে মানবিক সংকট।

জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও জলাবদ্ধতায় জেলার অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পাহাড়ধস ও পানিতে ভেসে এ পর্যন্ত পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্গতদের জন্য ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সাতকানিয়ায় ভয়াবহ পরিস্থিতি

সবচেয়ে নাজুক অবস্থা সাতকানিয়া উপজেলায়। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ডলু খালের বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে চলে গেছে। দুই লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

ঘণ্টায় ঘণ্টায় নদ-নদীর পানি বাড়ছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও অবনতি হচ্ছে। নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, দোকানপাট, কৃষিজমি ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেছে। রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়ায় বহু পরিবার কয়েকদিন ধরে রান্না করতে পারছে না। কেউ শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছেন, আবার কেউ প্রতিবেশীর উঁচু বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে রান্না করছেন।

নলকূপ ডুবে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। পানিতে সাপসহ বিষাক্ত প্রাণী চলে আসায় রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন অনেক পরিবার।

টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা প্লাবিত। ছবি: সংগৃহীত

টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা প্লাবিত। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হাসমতের দোকান এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের বুড়ির দোকান ব্রিজ এলাকায় প্রবল স্রোতে পানি ওঠায় বান্দরবানের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান সারাবাংলাকে বলেন, ‘দুর্গত মানুষের জন্য ৮৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম ২৪ ঘণ্টা চালু রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়।’

লোহাগাড়ায় প্লাবিত পাঁচ ইউনিয়ন

লোহাগাড়া উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আমিরাবাদ ইউনিয়ন। পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে অনেক এলাকা পানির নিচে চলে গেছে। বহু মানুষ গৃহবন্দি হয়ে পড়েছেন। উপজেলা প্রশাসন ১২টি আশ্রয়কেন্দ্র খুললেও অনেকেই এখনো বাড়িঘর ছেড়ে সেখানে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন। ইউএনও মো. বায়েজিদ বিন আখন্দ সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমিরাবাদ থেকে ৯০ জনকে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। পদুয়া ইউনিয়নের পানিবন্দি মানুষদের উদ্ধারে প্রশাসনের দল কাজ করছে।’

টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ভেঙে গেছে মাটির ঘর। ছবি: সংগৃহীত

টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ভেঙে গেছে মাটির ঘর। ছবি: সংগৃহীত

বাঁশখালীতে পানির নিচে শত শত গ্রাম

বাঁশখালীতেও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বন্যা। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের ২১২টি গ্রামের অধিকাংশই পানির নিচে। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি ঢল ও বানের পানি হঠাৎ করেই মানুষের ঘরে ঢুকে পড়ায় প্রস্তুতির কোনো সুযোগ পাননি স্থানীয়রা। মাটির ঘর একের পর এক ভেঙে পড়েছে। ধান, চাল, আসবাবপত্র, মাছের ঘের, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর খাদ্য পানিতে ভেসে গেছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না, ফলে অনেকেই বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়েছেন।

বাঁশখালীর বাসিন্দা মোহাম্মদ রিয়াদ সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘রাতভর ঘুমাতে পারব না । এবকে পর এক মাটির ঘর ভেঙে পড়ার শব্দ শুনেছি। চারপাশে শুধু পানি আর পানিতে ভেসে যাচ্ছে
ঘরের জিনিসপত্র।’

পাতিলে করে আট মাসের শিশুকে উদ্ধার

এই দুর্যোগের মধ্যেও সামনে এসেছে মানবিকতার এক অনন্য দৃশ্য। বুধবার (৮ জুলাই) রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাঁশখালীর চেচুরিয়া ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় পানিবন্দি কয়েকটি পরিবারের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল উদ্ধার অভিযান চালায়। গলাসমান পানি ঠেলে উদ্ধারকর্মীরা পাঁচ শিশু ও আট নারীকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যান।

অভিযানের সময় আট মাস বয়সী এক শিশুকে একটি বড় পাতিলের মধ্যে বসিয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। আরেক উদ্ধারকর্মী শিশুটির ওপর ছাতা ধরে রাখেন, যাতে বৃষ্টির পানি তার গায়ে না লাগে। ফায়ার সার্ভিসের এই মানবিক উদ্ধার অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।

টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ভেঙে গেছে রাস্তা। ছবি: সংগৃহীত

টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ভেঙে গেছে রাস্তা। ছবি: সংগৃহীত

চন্দনাইশ উপজেলার আটটি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার মধ্যে হাশিমপুর ও জোয়ারা ইউনিয়ন ছাড়া সব ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া রাউজান, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও বোয়ালখালী,সন্দীপের বিভিন্ন উপজেলায় বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। অনেক গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

প্রশাসনের তৎপরতা

বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। উদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদার করতে সাতকানিয়ার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১০টি স্পিডবোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে জেলার ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের জন্য চিড়া, মুড়ি, গুড় এবং শিশুদের জন্য মাফিন, কেক, বিস্কুট, ওরস্যালাইন ও পাঁচ লিটার করে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। প্রথম দফার বরাদ্দ এরই মধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং নতুন বরাদ্দও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের চাহিদার ভিত্তিতে দ্রুত বিতরণ করা হবে।