ঢাকা: বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক বিন হারুন চৌধুরী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরে জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদেশি বিনিয়োগ, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, হালাল শিল্প এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক উৎপাদন ও লজিস্টিকস হাবে পরিণত করার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে চীনের উদ্যোক্তারা ১৮ মাসের মধ্যে প্রথম কারখানা চালু করার লক্ষ্য নিয়েছেন এবং আগামী মাসেই গ্রাউন্ড ব্রেকিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন।
বিডা চেয়ারম্যান বলেন, দেশের শিল্পায়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি। এ কারণে মালয়েশিয়া সফরে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। সেখানে গ্যাস সরবরাহ, তেল-গ্যাস অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট নিরসনে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
তিনি জানান, মালয়েশিয়ার একাধিক বড় বিনিয়োগকারী লজিস্টিকস ও টেলিযোগাযোগ খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে হালাল শিল্প বিকাশেও দুই দেশের মধ্যে অগ্রগতি হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশন মালয়েশিয়ার জাকিম কর্তৃক স্বীকৃতি পাওয়ায় এখন দেশে আন্তর্জাতিক মানের হালাল সনদ দেওয়া সম্ভব হবে।
আশিক বিন হারুন বলেন, বাংলাদেশে একটি হালাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ে তুলে বৈশ্বিক হালাল সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও চীনে হালাল খাদ্য ও প্রসাধনী রফতানির অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশকেও সেই আঞ্চলিক নেটওয়ার্কে যুক্ত করার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
চীন সফরের বিষয়ে তিনি বলেন, ডালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী একাধিক বৃহৎ চীনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি বাংলাদেশে নিজস্ব অর্থায়নে ‘গ্রিন সিটি’ নির্মাণসহ নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। এসব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, সম্প্রতি চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার চুক্তি সই হয়েছে। পাশাপাশি মংলা বন্দরের আধুনিকায়ন প্রকল্পের পাশেই প্রায় ১০০ একর জমিতে চীনা শিল্পপার্ক গড়ে তুলতে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে।
বিডা চেয়ারম্যান বলেন, আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে প্রায় এক দশক ধরে আলোচনা চললেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তবে গত কয়েক মাসে দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট চীনা ডেভেলপারদের চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, ৭ বছরের প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবর্তে আগামী ১৮ মাসের মধ্যে প্রথম কারখানা চালু করতে হবে। তারা সেই লক্ষ্য গ্রহণ করেছে এবং আগামী মাসেই গ্রাউন্ড ব্রেকিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন, পাঁচ বছরের করনীতি (ট্যাক্সেশন আউটলুক) প্রকাশ এবং ধারাবাহিক নীতিগত স্থিতিশীলতার বিষয়গুলো বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
আশিক বিন হারুন চৌধুরী জানান, চীনের বিনিয়োগ সহায়ক সংস্থা সিসিপিআইটির (CCPIT) সঙ্গে বিডার একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এর আওতায় চীনের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশে বিনিয়োগবিষয়ক সেমিনার, প্রশিক্ষণ ও প্রচারণা চালানো হবে। একই সঙ্গে চীনা বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে বিডার ওয়েবসাইট প্রথমবারের মতো চীনা ভাষায় চালু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, চীনের প্রায় ৮০ জন শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তার অংশগ্রহণে আয়োজিত বিনিয়োগ সম্মেলনে বাংলাদেশকে ‘ওপেন ফর বিজনেস’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, স্বাস্থ্যসেবা, মেডিকেল ডিভাইস, অটোমোবাইল, রিসাইক্লিং এবং তেল-গ্যাস খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
বিডা চেয়ারম্যান আরও বলেন, জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য চীনের একাধিক প্রতিষ্ঠান ও মালয়েশিয়ার পেট্রোনাসের সঙ্গে পৃথক বৈঠক হয়েছে। ডিজেল সরবরাহ, এলএনজি আমদানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গ্যাস অবকাঠামো উন্নয়নে দ্রুত অগ্রগতির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, কিছু বিষয় কৌশলগত কারণে এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে আগামী তিন মাসের মধ্যে জ্বালানি ও বিনিয়োগ—উভয় ক্ষেত্রেই সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি দৃশ্যমান অগ্রগতি দেশবাসী দেখতে পাবে।
সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ও পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম উপস্থিত ছিলেন।