Tuesday 23 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

১১৫ দিন পর হরমুজ পার হলো ‘বাংলার জয়যাত্রা’

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৩ জুন ২০২৬ ১২:০৩ | আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ ১৫:৪১

জাহাজ এমভি ‘বাংলার জয়যাত্রা’।

চট্টগ্রাম: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের কারণে দীর্ঘ ১১৫ দিন পারস্য উপসাগরে আটকে থাকার পর অবশেষে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ এমভি ‘বাংলার জয়যাত্রা’।

সোমবার (২২ জুন) দিবাগত রাত তিনটার দিকে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হয়। বর্তমানে জ্বালানি (বাংকার) গ্রহণের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

জাহাজের অতিরিক্ত চিফ অফিসার প্রণয় সাহা খুদে বার্তায় এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানান, ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রুকে নিয়ে জাহাজটি নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।

বিজ্ঞাপন

সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি খ্যাতনামা চার্টারারের অধীনে ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ গত ২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে।

বিএসসির তথ্যমতে, গত ২ ফেব্রুয়ারি জাহাজটি হরমুজ হয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে। পরে কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরু হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়।

যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও জাহাজটি ১১ মার্চ জেবেল আলী বন্দরে স্টিল কয়েলের কার্গো সফলভাবে খালাস করে।

কার্গো খালাসের পর যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় জাহাজটিকে অলস না রেখে এবং চার্টারারের দৈনিক ভাড়া (হায়ার) অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে বিএসসি নতুন বাণিজ্যিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী জাহাজটিকে সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দরে পাঠানো হয়। সেখান থেকে প্রায় ৩৭ হাজার মেট্রিক টন সার বোঝাই করে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন ও ডারবান বন্দরের উদ্দেশে যাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সেটি বন্দরে আটকে পড়ে।

পরে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলে গত ৮ এপ্রিল জাহাজটি রাস আল খায়ের ত্যাগ করলেও, ১০ এপ্রিল হরমুজ অতিক্রমের সময় ইরানি কোস্ট গার্ডের বাধার মুখে পড়ে। এরপর জাহাজটি ওমানের মিনা সাকার বন্দরের বহির্নোঙরে আশ্রয় নেয়।

বিএসসি জানিয়েছে, সীমাহীন প্রতিকূলতার মধ্যেও জাহাজটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাহসিকতা, দক্ষ নৌ-পরিচালনা এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সার্বক্ষণিক তদারকির ফলে এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। সর্বশেষ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার অগ্রগতি এবং বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হতে সক্ষম হয়েছে।

বিএসসি জানায়, সংকটকালেও দক্ষ বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার কারণে নতুন কার্গো বোঝাইয়ের জন্য জাহাজটিকে একদিনের জন্যও ‘অফ-হায়ার’ হতে হয়নি। ফলে নিয়মিত ভাড়া প্রাপ্তি অব্যাহত ছিল।

তবে সার বোঝাইয়ের পর হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজটি আর ওই এলাকা ত্যাগ করতে পারেনি।

দীর্ঘ অচলাবস্থার মধ্যে গত ১৮ এপ্রিল ইরান নৌবাহিনী নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণ দেখিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজটির ট্রানজিট বা পারাপারের অনুমতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে।

এর ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের স্পর্শকাতর যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে জাহাজটি দীর্ঘ সময় কার্যত আটকা পড়ে।

বিএসসি জানায়, চলতি বছরের শুরু থেকে হরমুজ প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ‘চোক পয়েন্টে’ পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ ঝুঁকি, বিমার প্রিমিয়াম বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধের মধ্যেও ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’র নিরাপদ ট্রানজিট দেশের সামুদ্রিক খাতের সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

প্রতিষ্ঠানটির মতে, বিএসসির ইতিহাসে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন সংকট মোকাবিলার ঘটনা বিরল এবং এটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক খাতেও বাংলাদেশের সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

দীর্ঘ অচলাবস্থার পুরো সময়ে জাহাজের ৩১ জন নাবিক ও ক্রু সদস্যের মনোবল ধরে রাখতে বিএসসি বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

জাহাজে সুপেয় পানি, খাদ্য, রসদ ও জ্বালানির সরবরাহে কোনো ঘাটতি হতে দেওয়া হয়নি।

এছাড়া নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে নিয়মিত সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি বিশেষ অনুমোদনের মাধ্যমে দৈনিক ৫ মার্কিন ডলার মিল অ্যালাউন্স, ঈদ উপলক্ষ্যে বিশেষ প্রণোদনা এবং ‘ওয়ার ওয়েজ’ প্রদান করা হয়েছে।

বিএসসির মতে, এসব পদক্ষেপ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নাবিকদের দায়িত্ব পালনে উৎসাহ জুগিয়েছে।

বিএসসি আরও জানায়, পুরো সংকটকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রেখেছেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

এছাড়া, নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহণ প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া ভিডিও কনফারেন্স ও টেলিফোনের মাধ্যমে জাহাজের ক্যাপ্টেন ও নাবিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।

বিশেষ করে জাহাজটি যখন হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছিল, তখন নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় ও বিএসসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মেরিন ট্রাফিকের মাধ্যমে জাহাজটির গতিবিধি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

বিএসসি মনে করে, সরকার ও মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদারকি, প্রতিষ্ঠানের সংকট ব্যবস্থাপনা এবং জাহাজের ক্যাপ্টেন, চিফ ইঞ্জিনিয়ারসহ সব ক্রু সদস্যের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলেই এ সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে।

 

সারাবাংলা/একে/এসএন/ এএ
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর