Tuesday 21 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সরকারি বন্ড ‘নিরাপদ’ আশ্রয়
বেসরকারি বিনিয়োগে উদাসীনতা দেখাচ্ছে ব্যাংকগুলো

আদিল খান স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২১ এপ্রিল ২০২৬ ২২:৪৩

বেসরকারি বিনিয়োগে উদাসীনতা। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: সরকারি বন্ড বিলে বিনিয়োগ নিরাপদ ভেবে অধিকাংশ ব্যাংক বেসরকারি বিনিয়োগে উদাসীনতা দেখাচ্ছে। এতে সরকারের ঋণ লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ হয়ে গেছে। অথচ দেশের বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হচ্ছে। নতুন কারখানা সৃষ্টি ও উৎপাদনের জন্য চাহিদা মাফিক কাঁচামাল আমদানি করতে পারছে না। এতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। আর জানুয়ারিতে নেমেছে ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। কিন্তু গত বছরের নভেম্বরেও বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। সেই হিসাবে তুলনা করলে দেখা যায় যে, ধারাবাহিকভাবে ঋণপ্রবাহ কমছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে একদিকে ব্যাংক ঋণ দিতে উদাসীনতা দেখাচ্ছে, অপরদিকে নতুন উদ্যোক্তারা চড়া সুদে নতুন ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত কার্যত ধীর গতিতে চলছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ঋণের পরিমাণ বাড়লেও প্রবৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ১৬ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। একবছরে ঋণ বেড়েছে এক লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ১১ শতাংশ। অথচ বেসরকারি খাতে চলতি অর্থবছরের ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সাড়ে ৮ শতাংশ। আবার সরকারি ঋণের লক্ষ্য ছিল এক লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে সেই লক্ষ্য ছাড়িয়ে সরকার নিট ঋণ নিয়েছে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। আর অর্থবছরের শেষ তিন মাসে সরকারি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা। ধারণা করা হচ্ছে এই মাত্রাও ছাড়িয়ে যাবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ সুদহার ঋণ সংকোচনের অন্যতম প্রধান কারণ। বর্তমানে অনেক ব্যাংকের ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়েছে ঋণের খরচে। ফলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ ছাড়া, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ঋণ বিতরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত করছে। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যাংকের অর্জিত মুনাফার বড় অংশ এসেছে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ থেকে। একবছর ধরেই সরকারের ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার ১১-১৩ শতাংশ, যা নিকট অতীতে দেখা যায়নি। এত উচ্চ সুদের কারণে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানতের বড় অংশই সরকারকে ঋণ দেয়ার কাজে ব্যবহার করছে। এতে ব্যাংকের মুনাফা বাড়লেও সরকারের সুদ খাতের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসি আই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘উচ্চ সুদহারে ব্যাংকঋণ নিয়ে কোনো শিল্প প্রকল্প লাভজনক করা কঠিন। এতে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছেন না, বরং বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন। আবার ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে। খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৫ শতাংশের বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তারা অর্থায়ন পাচ্ছেন না। ব্যাংকে টাকা থাকলেও ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ, ঝুঁকি নিতে চাইছে না ব্যাংকগুলো।’

তিনি বলেন, ‘ডলার সংকট ঋণ সংকোচনের অন্যতম বড় কারণ। ডলারের দাম ১২২ টাকার বেশি হওয়ায় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এতে নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগ স্থগিত রেখেছেন।’

বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গ্যাসসংকটের কারণে উৎপাদনশীলতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ডলার সংকটও ঋণচাহিদা কমিয়ে দিয়েছে। ডলারের বিনিময় হার বেশি হওয়ায় কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ব্যয় বেড়েছে। এতে নতুন শিল্প স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগ কমে গেছে।

এর আগে নতুন গভর্নর দায়িত্ব নিয়েই অভ্যন্তরীণ বৈঠকে সুদহার কমানোর ঘোষণা দেন। মুদ্রানীতি কমিটির একটি বৈঠকও ডাকা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তা স্থগিত হয়েছে। ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যে কারণে আপাতত সুদহার কমাবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী জুন নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ ধরা হয়েছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ৭ দশমিক ২০ শতাংশ প্রাক্কলনের বিপরীতে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ অর্জিত হয়। তবে রাজনৈতিক সরকারের সময়ে বিনিয়োগ খরা কাটবে এমন প্রত্যাশা থেকে প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন বাড়ানো হয়েছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ঋণের চাহিদা নেই। ব্যাংকগুলো এখন ট্রেজারি খাতে বিনিয়োগ করে মুনাফার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ ছাড়া, অনেক ব্যাংক ভোক্তা ও ক্ষুদ্র-মাঝারি খাতের ঋণে নজর বাড়িয়েছে। যদি একটি স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তাহলে নতুন ঋণের চাহিদা বাড়বে। সেজন্য ব্যাংকগুলোকে এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। আমানত বাড়াতে নজর দিতে হবে।’

বিজ্ঞাপন

আরো

আদিল খান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর