ঢাকা: রাজধানীর ব্যস্ততম কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ। একদিকে শাহবাগ, অন্যদিকে বাংলামোটর; এই দুই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত পরীবাগ মোড়। প্রতিদিন এই পথে হাজারো শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ এবং সাধারণ পথচারীরা যাতায়াত করেন। অথচ, এই ব্যস্ততম সড়কের দুই পাশকে যুক্ত করা একমাত্র ফুটওভার ব্রিজটি এখন এলাকাবাসীর কাছে আতঙ্কের নাম।
ব্যস্ততম সড়কের বুকে সংস্কারের অভাবে লোহার জং ধরা এই কাঠামোটি এখন জীবন্ত ‘মরণ ফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। যে ব্রিজটি হওয়ার কথা ছিল স্বস্তির প্রতীক, সেটি যেন নিঃশব্দে কোনো বড় দুর্ঘটনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
সরেজমিনে পরীবাগ ফুটওভার ব্রিজে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। পা রাখতেই যেন কলিজা কেঁপে ওঠে যেকোনো পথচারীর। ব্রিজের মূল পাটাতনের লোহার পাতগুলো মরচে ধরে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে; আবার অনেক জায়গায় ক্ষয়ে ফুটো হয়ে গেছে। ঝুরঝুরে হয়ে গেছে মরিচা ধরে। অনেক জায়গায় তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। নিচ দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দে বয়ে যাওয়া দ্রুতগামী বাস-ট্রাক দেখা যায় ওই গর্তের ফাঁক দিয়ে। অসাবধানতায় একটি পা পিছলে গেলেই বড় ধরনের অঙ্গহানি কিংবা নিশ্চিত মৃত্যু। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে বা বৃষ্টির দিনে এই ফাঁদগুলো চেনা দায় হয়ে পড়ে।
রাস্তা পারাপারের একমাত্র মাধ্যম ব্রিজটি
পরীবাগের বাসিন্দা ও নিয়মিত এই ব্রিজ ব্যবহারকারী রফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘রাস্তা পারাপারের প্রধান মাধ্যম এই ব্রিজটি। দীর্ঘদিন ধরে এর বেহাল দশা। অনেক মানুষই জানেন না যে, ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ। কেউ কেউ তো না জেনেই উঠে পড়ে ব্রিজে। এই ব্রিজ দিয়ে পার হওয়া মানে জীবন হাতে নিয়ে চলা। যেকোনো সময় যে কেউ নিচে পড়ে প্রাণ হারাতে পারে। অথচ, বাধ্য হয়েই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করছে অনেকে।’
স্থানীয় শিক্ষার্থী ইমরান সারাবাংলাকে বলেন, ‘রাতে টিউশনি শেষে ফেরার সময় মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে হাঁটতে হয়। একটু অসতর্ক হলেই পা ঢুকে যাবে লোহার পাতের ফাঁকে।’
ঝুঁকিতে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন বয়স্ক মানুষ, নারী ও শিশুরা। ব্রিজটি ব্যবহার করতে না পারায় ব্যস্ত রাস্তাটি পায়ে হেঁটে পারাপার হতে হচ্ছে তাদের। আবার অনেকেই না জেনে ব্রিজটিতে উঠে পড়ছেন বিপদে। আবার কেউ কেউ মাঝ পথে গিয়ে অবস্থা বেগতিক দেখে নেমে পড়ছেন। লোহার পাতের ধারালো অংশগুলো জেগে আছে বর্শার মতো।
পরীবাগে বসবাসকারী ফারিবা তাবাচ্ছুম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা কি কোনো বড় দুর্ঘটনার অপেক্ষায় আছি? প্রতিদিন প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কেউ কেউ নড়বড়ে ব্রিজ পার হন এবং কেউ কেউ পায়ে হেঁটে সড়ক পার হন। কর্তৃপক্ষের কাছে কি আমাদের জীবনের কোনো মূল্য নেই? কারো মৃত্যু হলে ব্রিজটি সংস্কার করা হবে?’
রাতের আঁধারে বাড়ে আতঙ্ক
অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে এই ব্রিজটি যেন এক অনিরাপদ জোনে পরিণত হয়। ব্রিজটির এই বেহাল দশায় অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে এখানে বেড়েছে ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের উৎপাত। সাধারণ পথচারীদের জন্য এই ব্রিজ এখন এক অবর্ণনীয় ভোগান্তির নাম। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য যেন আরও ক্ষতিকর রূপ ধারণ করছে। এছাড়া, কেউ ব্রিজটি পাড় হতে গিয়ে ঘটতে পারে প্রাণহানি।
প্রশাসনের নীরবতা
এলাকাবাসীর দাবি, বারবার অভিযোগ করা সত্ত্বেও সিটি করপোরেশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ টেকসই কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আধুনিক ঢাকা গড়ার যে স্লোগান আমরা শুনি, তার সঙ্গে জরাজীর্ণ এই ব্রিজের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া ভার। জরাজীর্ণ এই ব্রিজটি এখন আর মেরামতের যোগ্য নয়, বরং এটি ভেঙে নতুনভাবে গড়া সময়ের দাবি।
শহরের অন্যতম প্রধান সড়কে অবস্থিত হওয়ার পরও ব্রিজটির এমন বেহাল দশা প্রশাসনের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে কীভাবে? তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ। তারা বলেন, আমরা নিয়মিত ট্যাক্স দিচ্ছি, কিন্তু নিরাপদ একটা রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা পাব না? এই ব্রিজটি এখন পারাপারের জন্য নয়, বরং মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘এটা আমাদের নলেজে এসেছে। এটিসহ আরও সাতটি ফুটওভার ব্রিজ মেরামতের কাজ হাতে নিয়েছি। ওয়ার্ক অর্ডার হয়ে গেছে। এর মধ্যে সবার আগে পরীবাগের ফুটওভার ব্রিজের অগ্রাধিকার আগে দিতে বলেছি। ঠিকাদার সেভাবেই কাজ করবে আশা করছি।’
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই ধরনের জনগুরুত্বপূর্ণ ব্রিজের লাইফস্প্যান বা মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তা দ্রুত ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা উচিত। কেবল তালি দিয়ে বা আংশিক মেরামত করে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পরীবাগের এই ব্রিজটি এখন আর মেরামতের পর্যায়ে নেই, এর পুরোটাই পরিবর্তন করা জরুরি।’
শহরের আধুনিকতার পরিচয় পাওয়া যায় তার পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের অবস্থায়। পরীবাগের এই ফুটওভার ব্রিজটি কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কি যথাযথ সংস্কার পাবে? নাকি একটি বড় বিপর্যয়ের পর টনক নড়বে? পরিবাগের এই মরণফাঁদটি সংস্কার বা নতুন করে নির্মাণ করা এখন বিলাসিতা নয়, বরং বাঁচার দাবি। রাজধানীর ব্যস্ততম এই সড়কের ওপর দিয়ে মানুষ যেন বুক ফুলিয়ে নির্ভয়ে হাঁটতে পারে- এটুকুই কি খুব বেশি চাওয়া? কর্তৃপক্ষ কি শুনতে পাচ্ছে পরিবাগের সাধারণ মানুষের এই প্রাণের আকুতি?