ঢাকা: ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই। ভোর রাত। কল্যাণপুরের ‘তাজ মঞ্জিল’ (স্থানীয়রা বলে জাহাজ বিল্ডিং)-এর সামনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকশ’ সশস্ত্র সদস্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় ‘অপারেশন স্টর্ম-২৬’। অপারেশন চলে ঘণ্টাব্যাপী। কথিত জঙ্গিবিরোধী ওই অভিযানে নয় তরুণ নিহত হয়। পুলিশ দাবি করে, বড় ধরনের নাশকতার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সশস্ত্র জঙ্গিরা। তারা ও গুলশান ট্র্যাজেডির (হলি আর্টিজন হত্যাকাণ্ড) সঙ্গে জড়িতরা একই গ্রুপের সদস্য।
তবে সেই ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এক সময় ‘অপারেশন স্টর্ম-২৬’ নামে প্রচারিত ওই ঘটনাকে এখন পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, নিহতদের অনেককে ঘটনার আগেই বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করা হয়েছিল। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় গোয়েন্দা সংস্থার হেফাজতে ছিলেন। পরে তাদের কল্যাণপুরের ওই বাড়িতে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর পর ঘটনাটিকে বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
এ ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় উচ্চপদস্থ সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ মোট আটজনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাবেক আইজিপি, সাবেক ডিএমপি কমিশনার, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের নাম রয়েছে।
২০২৬ সালের শুরুতে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নিয়ে একাধিক আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। এরই মধ্যে কয়েকজন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। তবে কয়েকজন পলাতকও রয়েছেন। বর্তমানে মামলাটি অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং শিগগিরই এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অভিযোগ গঠন সম্পন্ন হলে মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচার শুরু হবে।
এই ঘটনাকে ঘিরে বর্তমানে দেশজুড়ে চলছে সমালোচনা। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এটি বিচারবহির্ভূত হত্যার একটি বড় উদাহরণ। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুব রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘কল্যাণপুরের জাহাজবিল্ডিংয়ের ঘটনাটি যদি সত্যিই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয় বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুতর অপব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হবে। সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের অধিকার রয়েছে, যা কোনো অবস্থাতেই লঙ্ঘন করা যায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বন্দুকযুদ্ধের নামে কাউকে হত্যা করা হলে সেটি আইনসম্মত নয়। যদি না তা আত্মরক্ষার অপরিহার্য পরিস্থিতিতে ঘটে এবং আদালতে প্রমাণিত হয়। এই ঘটনায় যেহেতু অভিযোগ উঠেছে যে ভিকটিমদের আগে থেকেই আটক রাখা হয়েছিল। তাই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর এবং নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত।’
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। এই মামলার রায় ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করবে।’
১০ বছর পর কল্যাণপুরের সেই রাতের ঘটনাকে ঘিরে মূল প্রশ্ন এখনো একই রয়ে গেছে। সেটি কি সত্যিই জঙ্গি দমন অভিযান ছিল, নাকি পরিকল্পিতভাবে সাজানো একটি হত্যাকাণ্ড?