কক্সবাজার: ‘আমাকে বাঁচাও, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে`’- কান্নাভেজা কণ্ঠ ও আতঙ্কে ভরা চোখে বুকভাঙা এই আবেদন ছিলো তানিয়া আক্তারের (২২)। স্বামীর পরকীয়ার জেরে নির্যাতনের শিকার তানিয়া বুধবার (২২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় নিজের মোবাইলে ৪৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও রেকর্ড করে পাঠান বোন শাহিদা আক্তারের ‘ইমো’তে। মোবাইলের ৬ ইঞ্চির পর্দায় দেখা সেই আকুতি এখনো কানে বাজে শাহিদার। কিন্তু সেই আকুতির জবাব দেওয়ার আগেই নিথর হয়ে যায় তানিয়া। যা এখনো তাড়া করে ফিরছে তার পরিবারকে।
কক্সবাজারের রামু উপজেলার চাকমারকুল ইউনিয়নের কলঘর মিস্ত্রিপাড়া এলাকায় বুধবার এ ঘটনা ঘটে। শ্বশুরবাড়ির একটি কক্ষ থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তাকে। প্রথমে নেওয়া হয় রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। পরে অবস্থার অবনতি হলে পাঠানো হয় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরদিন সকালে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে তানিয়ার মরদেহ নিতে আসা বোন শাহিদা আক্তারের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। বারবার তিনি স্মরণ করছিলেন সেই ভিডিও বার্তা, “আমাকে বাঁচাও…”। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনও যেন নির্বাক হয়ে যান।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, তানিয়া আক্তার রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের চেইন্দা খন্দকারপাড়ার বাসিন্দা ইসমাইল হোসেনের মেয়ে। প্রেমের সম্পর্কের পর একই এলাকার আসিফ শাহরিয়ার ছোটনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। শুরুতে পরিবার রাজি না থাকলেও পরে মেয়ের সুখের কথা ভেবে সম্পর্কটি মেনে নেয়।
কিন্তু স্বজনদের অভিযোগ, বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই সেই সংসারে শুরু হয় অশান্তি। তানিয়ার বড় বোন শাহিদা আক্তারের অভিযোগ, তার স্বামী অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। প্রায়ই রাতে বাড়িতে ফিরতেন না। ওই নারীর বাসায় গিয়ে রাত কাটাতেন। পরে তানিয়া তার স্বামীর মোবাইলে ওই নারীর সঙ্গে তোলা ছবিও দেখতে পান। বিষয়টি নিয়ে শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে অভিযোগ করলেও উলটো তাকেই দোষারোপ করা হয়। অপমান, গালাগালি সবকিছুই সহ্য করতে হতো তাকে।
শাহিদার স্বামী মো. সুমন জানিয়েছেন, ঘটনার দিন বিকেলেই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিকেল ছয়টার দিকে তানিয়া তার বড় বোনকে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান। পরে শাহিদা তার স্বামীকে দিয়ে তানিয়ার স্বামীর সঙ্গে কথা বলান। তাকে পরকীয়ার সম্পর্ক থেকে সরে আসতে বলা হয়। এরপরই শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক, যা একপর্যায়ে নির্যাতনে রূপ নেয়- এমনটাই অভিযোগ স্বজনদের।
তার ভাষ্য, “ওই অবস্থায়ই তানিয়া আমাদের কাছে ভিডিও পাঠায়। সেখানে ওর কণ্ঠে শুধু ভয় ছিল। বাঁচার আকুতি ছিল। কিন্তু আমরা পৌঁছানোর আগেই সব শেষ হয়ে যায়।”
স্বজনদের দাবি, তানিয়ার স্বামী কোরআন শরীফ ছুঁয়ে ওই সম্পর্ক থেকে সরে আসার শপথও করেন। কিন্তু সেই শপথের কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা।
তানিয়ারি এই মৃত্যুকে ঘিরে এখন প্রশ্ন উঠেছে। এটি আত্মহত্যা, নাকি পরিকল্পিত হত্যা ? পরিবারের দাবি, তানিয়াকে হত্যা করে ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে সাজানো হয়েছে।
শাহিদা আক্তারের ভাষ্য, “আমার বোন আত্মহত্যা করতে পারে না। ওকে মেরে ফেলা হয়েছে। পরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে আত্মহত্যা মনে হয়।”
পরিবারের এ অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে একটি তথ্য, ঘটনার পর থেকেই স্বামী শাহরিয়ার ছোটন পলাতক রয়েছেন।
এদিকে, তানিয়ার মৃত্যুর পর সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে তার এক বছর বয়সী কন্যাসন্তানটি। মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত এই শিশুকে কোলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন স্বজনেরা। পরিবার বলছে, এই শিশুর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
রামু থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ফরিদ জানিয়েছে, ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।
তার ভাষ্য, “প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার আলামত পাওয়া গেছে। তবে পরিবারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা জানতে পুলিশ কাজ করছে।”