যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল আলোচিত বৈঠক বেইজিংয়ে শেষ হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) স্থানীয় সময় দুপুরে দুই ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে মূলত দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য সংঘাত, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, তাইওয়ান সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
যদিও এই সফর ঘিরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল ছিল, তবে বড় ধরনের কোনো নাটকীয় সাফল্যের খবর এখনও পাওয়া যায়নি। বৈঠক শুরুর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সম্মানে একটি বর্ণাঢ্য অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন শি জিনপিং।
সৌহার্দ্যপূর্ণ আবহের মধ্যেও তাইওয়ান ইস্যুতে ওয়াশিংটনকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তাইপে ইস্যুটি সঠিকভাবে সামলানো না গেলে দুই দেশ সরাসরি বিপজ্জনক সংঘাতের দিকে ধাবিত হতে পারে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শি জিনপিং বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে একটি নতুন সন্ধিক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্থিতিশীল সম্পর্ক পুরো বিশ্বের জন্যই মঙ্গলজনক। একে অপরের প্রতিপক্ষ হওয়ার বদলে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করলে উভয় পক্ষই লাভবান হবে।
শি জিনপিংয়ের মতে, দুই দেশ যখন মুখোমুখি সংঘাতের পথ বেছে নেয়, তখন উভয়কেই চড়া মূল্য দিতে হয়। তাইওয়ান সংকটকে দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এ বিষয়ে সতর্কভাবে পা ফেলার পরামর্শ দেন।
উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বর মাসে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল অস্ত্র সহায়তার অনুমোদন দিয়েছিল, যদিও সেই অস্ত্রের সরবরাহ এখনও শুরু হয়নি। বেইজিং এই পদক্ষেপকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখে আসছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনা প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে তাকে একজন ‘অসাধারণ নেতা’ হিসেবে অভিহিত করেন। ট্রাম্প আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও শক্তিশালী হবে এবং দুই দেশ মিলে একটি চমৎকার ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সফরে মূলত বাণিজ্যিক সম্পর্কোন্নয়নের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। তিনি আশা করছেন, চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি পরিমাণে কৃষি পণ্য এবং যাত্রীবাহী বিমান ক্রয়ের বিষয়ে একমত হবে। গত বছর ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ফলে যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা নিরসনে দুই দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বিশেষ বোর্ড গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি এবং ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তায় যে টান পড়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে এই চীন সফর তার জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিও এই দুই নেতার আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। দীর্ঘ দুই মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় উন্মুক্ত করতে ট্রাম্প চীনের প্রভাব খাটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সম্মেলনের আগে তিনি তার সেই কড়া সুর কিছুটা নরম করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরান যাতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শর্তে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়, সে জন্য বেইজিং তেহরানকে কোনো চাপ দেবে কি না, তা নিয়ে এখনও কোনো স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। দুই দেশের এই শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনা মূলত সম্পর্কের টানাপড়েন কমিয়ে কিছুটা স্থিতিশীলতা আনার প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।