যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে বৈশ্বিক বিমান খাতে। ৭ সপ্তাহের অস্থিরতার পর আকাশপথ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলেও, নতুন করে দেখা দিয়েছে জেট জ্বালানির তীব্র সংকট—যা ইউরোপে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার মতো বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।
সংকটের মূল কেন্দ্র হরমুজ অচলাবস্থা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অচলাবস্থাই এই সংকটের মূল কারণ। স্বাভাবিক সময়ে বৈশ্বিক তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য বিঘ্নও দ্রুত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপের কাছে “সম্ভবত ৬ সপ্তাহের মতো জেট জ্বালানি অবশিষ্ট আছে”। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও যদি তেল সরবরাহ বন্ধ থাকে, তাহলে “শিগগিরই” ফ্লাইট বাতিল হতে পারে।
দাম বাড়ছে, মজুত কমছে
সরবরাহে ধাক্কার কারণে জ্বালানির দাম ইতোমধ্যেই তীব্রভাবে বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম যুদ্ধের আগে ব্যারেলপ্রতি ৬৬ ডলার থেকে বেড়ে ১০০ ডলারের ওপরে পৌঁছেছে। ইউরোপে জেট জ্বালানির মূল্যও রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে, যা বিমান সংস্থাগুলোর ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একই সঙ্গে ইউরোপের জ্বালানি সংরক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে মজুত দ্রুত কমে আসছে। বিকল্প উৎস, যেমন- যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য অঞ্চল থেকে সরবরাহ এনে এই ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে ইউরোপের বিমান খাত
ইউরোপের বিমান শিল্প এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ তাদের প্রায় ৭৫ শতাংশ জেট জ্বালানি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়।
জেট জ্বালানি মূলত চীন, মধ্যপ্রাচ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের তেল শোধনাগারে উৎপাদিত হয়। এসব বিশেষায়িত শোধনাগার বিশ্বের বড় বড় তেল কোম্পানি, যেমন- শেল, এক্সনমোবিল এবং সৌদি আরামকো পরিচালনা করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সরবরাহ বিঘ্ন পুরো বিমান খাতকে অচল করে দিতে পারে।
এনার্জি ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী জেট জ্বালানির ব্যবহার ছিল দৈনিক ৭.৭৮৮ মিলিয়ন ব্যারেল। ২০২৬ সালে এটি ২.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭.৯৮৮ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
এয়ারপোর্টস কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনাল ইউরোপ ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে, এই সংকট ইউরোপীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে। গ্রীষ্মকালীন পর্যটন মৌসুমের ঠিক আগে এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক, কারণ এই সময়েই ইউরোপে পর্যটকের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে।
ফ্লাইট বাতিলের শঙ্কা বাড়ছে
কয়েকটি ইউরোপীয় বিমানবন্দর জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ৩ সপ্তাহের মধ্যেই তারা জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে। এতে শহর থেকে শহরে স্বল্প ও মাঝারি দূরত্বের ফ্লাইট বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
গত সপ্তাহে এয়ারপোর্টস কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনাল ইউরোপ (এসি আই) ইউরোপীয় কমিশনকে লেখা এক চিঠিতে সতর্ক করে বলেছে, জ্বালানি সংকট ‘ইউরোপীয় অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’
ইউরোপের জ্বালানি সংরক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে ইতোমধ্যেই মজুত কমতে শুরু করেছে, আর যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য উৎস থেকে বিকল্প সরবরাহ মধ্যপ্রাচ্যের ঘাটতি পূরণে হিমশিম খাচ্ছে।
ইউরোপে জেট জ্বালানির মানদণ্ডমূল্য ১৮ মার্চ প্রতি টনে রেকর্ড ১,৮০০ ডলারে পৌঁছেছিল, যা এপ্রিল মাসে কিছুটা কমেছে।
কয়েকটি বিমানবন্দর সতর্ক করেছে, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ থাকে, তাহলে তিন সপ্তাহের মধ্যে তারা জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে।
এছাড়া, প্রণালিতে চলাচল বন্ধ থাকলে কিছু তেলজাত পণ্য সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যেতে পারে বলে আইইএ প্রধান বিরোল সতর্ক করেছেন।
তিনি এপিকে বলেন, ‘আমি বলতে পারি, খুব শিগগিরই আমরা এমন খবর শুনব যে জেট জ্বালানির অভাবে ইউরোপে শহর এ থেকে শহর বি-তে কিছু ফ্লাইট বাতিল হতে পারে।’
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) জার্মান এয়ারলাইন লুফথানসা জানিয়েছে, বাড়তি জেট জ্বালানির খরচ এবং ধর্মঘটের প্রভাবের ফলে “ক্ষতিগ্রস্ত এই এয়ারলাইনের আরও ক্ষতি কমাতে তারা তাদের আঞ্চলিক ইউনিট সিটিলাইন বন্ধ করবে।
বুধবার লুফথানসার সিটিও গ্রাজিয়া ভিট্টাদিনি রয়টার্সকে বলেন, “আমাদের জেট জ্বালানি সরবরাহকারীরা তাদের পূর্বাভাসের সময়সীমা পরিবর্তন করছে এবং তারা এক মাসের বেশি সময়ের জন্য পূর্বাভাস দিতে আর আগ্রহী নয়।
বৈশ্বিক প্রভাব
জেট জ্বালানি মূলত কেরোসিনভিত্তিক একটি পরিশোধিত পণ্য, যা বিমান চলাচলের জন্য অপরিহার্য। এর সরবরাহে বিঘ্ন শুধু বিমান খাতেই নয়, পর্যটন, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন আকাশপথে ছড়িয়ে পড়ছে। জ্বালানি সংকট যদি দ্রুত সমাধান না হয়, তাহলে ইউরোপে ফ্লাইট বাতিল, ভাড়া বৃদ্ধি এবং পর্যটন খাতে বড় ধাক্কার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সংকট কাটার সম্ভাবনা খুবই কম।
আলজাজিরার বিশ্লেষণ থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে ভাবানুবাদ।