মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। তবে দৃশ্যমান হিসাবের বাইরে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত খরচ আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের নীতি বিশেষজ্ঞ লিন্ডা জে. বিলমেস। তার মতে, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় শেষ পর্যন্ত ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, এমনকি ইতোমধ্যেই সেই সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
২০০৩ সালের ইরাক যু্দ্ধের সময়ও সরকারি হিসাব ও বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে বড় ফারাক দেখা গিয়েছিল। সে সময় কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস সরাসরি ব্যয় প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার বললেও অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজ ও বিলমেসের গবেষণায় দেখা যায়, প্রকৃত ব্যয় ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। পরবর্তীতে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ মিলিয়ে সেই খরচ দাঁড়ায় ৪ থেকে ৬ ট্রিলিয়ন ডলার।
এই অভিজ্ঞতার আলোকে বিলমেস মনে করছেন, ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ‘আন্ডারএস্টিমেশন (অবমূল্যায়ন)’ হচ্ছে। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, ইরান যুদ্ধের জন্য আমরা ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করব। সম্ভবত আমরা ইতোমধ্যেই ওই পরিমাণ ব্যয় করে ফেলেছি।’
দ্রুত বাড়ছে দৈনিক ব্যয়
বর্তমান সংঘাতে ব্যয়ের গতি অত্যন্ত দ্রুত বাড়ছে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই প্রায় ১১.৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছে পেন্টাগন। এই ব্যয়ের ধারা অব্যাহত থাকলে ১ এপ্রিলের মধ্যে যুদ্ধের খরচ ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেত বলে জানিয়েছে থিংক ট্যাংক আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট।
এআইই-এর অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, যুদ্ধের প্রথম মাসে প্রতিটি মার্কিন পরিবারের ওপর খরচ পড়েছে ২৬০ ডলার—যা সামান্য মনে হলেও যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ কোটির বেশি করদাতা পরিবার রয়েছে। বর্তমানে বিলমেসের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার (১৫ এপ্রিল) বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি অবরোধ করছে, তখন যুদ্ধ ‘খুব শিগগিরই’ শেষ হতে পারে। সংঘাত চলাকালে তিনি বারবার এ ধরনের মন্তব্য করেছেন। গত মাসে পেন্টাগন হোয়াইট হাউসের কাছে ইরান সম্পর্কিত প্রচেষ্টার জন্য অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের অনুমোদন চেয়েছে বলে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে।
বিলমেস বলেন, ২০ বছর আগের মতোই যুক্তরাষ্ট্র এখনও যুদ্ধ ও এর পরবর্তী প্রভাব মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণকে কম করে দেখছে। ফর্চুনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পরও যে ব্যয় অব্যাহত থাকে, তা প্রায়ই উপেক্ষিত হয় এবং এসব ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি বলেন, “যুদ্ধের খরচ সবসময় দীর্ঘমেয়াদি হয়’। যুদ্ধ আমাদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি খরচসাপেক্ষ। যুদ্ধের খরচ প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, এবং এসব খরচের কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।এই ধারা অব্যাহত থাকলে কয়েক সপ্তাহেই ব্যয় কয়েক দশক বিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়।
বিলমেসের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রতিদিন প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। তার মতে, যখন মানুষ যুদ্ধের খরচের কথা বলে, তখন তারা সাধারণত গোলাবারুদ ও যুদ্ধের সরাসরি খরচের কথা বোঝায়—“যেগুলো নিজেরাও কম করে হিসাব করা হয়।”
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) অনুমান করেছে, যুদ্ধের ষষ্ঠ দিনে শুধু গোলাবারুদের পেছনে ব্যয় হয়েছে ১১.৩ বিলিয়ন ডলার, যুদ্ধজনিত ক্ষতি ও অবকাঠামো ধ্বংসে ১.৪ বিলিয়ন ডলার, এবং অপারেশনে ২৬.৫ মিলিয়ন ডলার—মোট ১২তম দিনে প্রায় ১৬.৫ বিলিয়ন ডলার। তবে গোলাবারুদ প্রতিস্থাপনের খরচ ধরলে এই সংখ্যা আরও বাড়ে, যা প্রাথমিক ব্যয়ের ৫০ শতাংশ থেকে প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে বলে বিলমেস জানান।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে শুল্ক ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অস্ত্র নির্মাতা সতর্ক করেছে যে ২০২৪ সাল থেকে গোলাবারুদ উৎপাদনের খরচ ৮% থেকে ১৪% পর্যন্ত বেড়েছে।
অতিরিক্ত ব্যয় নির্ভর করবে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতির ওপর। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯টি সামরিক স্থাপনা রয়েছে, যার কিছু ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—সিএসআইএসের মতে, যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই যার ক্ষতি প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার।
সস্তা ড্রোন বনাম ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা—অসম যুদ্ধ
যুদ্ধের ব্যয়ের একটি বড় দিক হলো অসম খরচের বাস্তবতা। ইরানের ব্যবহৃত ড্রোন তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তা, কিন্তু সেগুলো প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। যেমন, ইরান যে ড্রোন ব্যবহার করে, তা তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তা, কিন্তু সেগুলো ভূপাতিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। রয়টার্সের মতে, ইরানের ব্যবহৃত একটি শাহেদ ড্রোনের দাম ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলারের মধ্যে, যেখানে সেটি ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের দাম প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার।
‘শুধু খরচ বেশি নয়, বরং আমরা এমন এক অসম পরিস্থিতিতে আছি যেখানে ড্রোন তৈরির খরচের তুলনায় প্রতিরোধের খরচ অনেক বেশি,’ বলেন বিলমেস। তিনি বলেন, এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ
যুদ্ধের প্রভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতিও বড় ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯টি সামরিক স্থাপনা রয়েছে, যার কিছু ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—সিএসআইএসের মতে, যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই যার ক্ষতি প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে শুল্ক ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অস্ত্র নির্মাতা সতর্ক করেছে, ২০২৪ সাল থেকে গোলাবারুদ উৎপাদনের খরচ ৮% থেকে ১৪% পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে যুদ্ধের সরাসরি ব্যয়ের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পুনরায় উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতেও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি খরচ
বিলমেসের মতে, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় খরচ তাৎক্ষণিক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি। বিশেষ করে ভেটেরানদের স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করে। গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স বিভাগ ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ৬.৯ মিলিয়নের বেশি ভেটেরান ও তাদের পরিবারকে ১৯৫ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়েছে, যা ২০২৩ সালের ১৩৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেশি।
যুদ্ধের সময় বেশি মানুষ মোতায়েন হওয়ায় এবং তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে থাকার কারণে স্বাস্থ্যগত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে, ফলে প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যয়ও বাড়ে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৬০ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। গালফ যুদ্ধের পর থেকে প্রায় ৫০% ভেটেরান প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য আবেদন করেছেন এবং তাদের মধ্যে ৩৭% আজীবন ভাতা পেয়েছেন বলে জানান বিলমেস। তিনি জানান, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, এই ব্যয় তত বাড়বে।
বাড়বে প্রতিরক্ষা বাজেট ও ঋণের চাপ
এই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। ২০২৭ সালের জন্য ট্রাম্প সামরিক বাজেটে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার যোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন, যা আগে প্রস্তাবিত ১ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি। যুদ্ধের কারণে কংগ্রেস এই বাজেট বৃদ্ধিতে সম্মতি দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি, যার ফলে প্রতিবছর শত শত বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত সামরিক ব্যয় হতে পারে— যা পরোক্ষভাবে ইরান যুদ্ধের মোট ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দেবে।
বিলমেস বলেন, ‘এই যুদ্ধের আগে কংগ্রেস এ ধারণা নিয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিল না, কিন্তু বিপুল পরিমাণ মজুত ও গোলাবারুদের ঘাটতি এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে সম্ভবত প্রেসিডেন্ট প্রতিরক্ষা বাজেটে অনেক বড় বৃদ্ধি নিশ্চিত করবেন।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, যেহেতু এই ব্যয়ের বড় অংশ ঋণ নিয়ে মেটানো হবে এবং একই সময়ে কর রাজস্ব কমানো হচ্ছে, তাই ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের জাতীয় ঋণের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় যেখানে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ জনগণের হাতে ছিল এবং মোট বাজেটের ৭% সুদ পরিশোধে ব্যয় হতো, এখন প্রায় ৩১ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ জনগণের হাতে এবং বাজেটের প্রায় ১৫% সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে।
উপসংহারে বিলমেস বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে আমরা উচ্চ সুদে ঋণ নিচ্ছি, মূলত এমন কিছুর জন্য যা শেষ পর্যন্ত মরুভূমিতেই পড়ে থাকবে।’
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধের ব্যয় শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, বাজেট ও ভবিষ্যৎ আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন গণমাধ্যম ফরচুন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে ভাবানুবাদ।