প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলে যুদ্ধ শেষ করার শর্ত মেনে নিতে তেহরানকে বাধ্য করার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবে ইরানের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ কার্যকর হয়েছে।
সোমবার (১৪ এপ্রিল) আর্ন্তজাতিক সময় রাত ২ টায় এই অবরোধ শুরু হয়। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এটিকে ‘অবৈধ’ এবং ‘জলদস্যুতার সমতুল্য’ বলে অভিহিত করেছে।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, যদিও ইরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং যুদ্ধের সময়েও তার কার্যক্রম চালিয়ে গেছে, তারপরও এ ধরনের অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করতে পারে।
এই অবরোধ ইরানের কতটা ক্ষতি করতে পারে?
ইরান মূলত তার বন্দরগুলোর মাধ্যমে তেল ও গ্যাস রফতানি করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই, তেহরানের কর্তৃপক্ষ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এই প্রণালি পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার একমাত্র জলপথ, যা দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথটি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায় এবং তখন থেকেই ইরান এই প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণ করছে। শুধুমাত্র তেহরানের সঙ্গে পৃথক চুক্তি করা কয়েকটি দেশের জাহাজকেই যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হচ্ছিল।
কিন্তু সেই পুরো সময়জুড়ে, ইরান নিজেই এই প্রণালি দিয়ে তার জ্বালানি পণ্য রফতারি অব্যাহত রেখেছিল।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের তেল রফতানি দেশটির মোট রফতানির প্রায় ৮০ শতাংশ। বাণিজ্য গোয়েন্দা সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ইরান মার্চ মাসে দৈনিক ১.৮৪ মিলিয়ন ব্যারেল (বিপিডি) অপরিশোধিত তেল রফতানি করেছে এবং এপ্রিল মাসে এখন পর্যন্ত দৈনিক ১.৭১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পাঠিয়েছে, যেখানে ২০২৫ সালে এর গড় পরিমাণ হবে দৈনিক ১.৬৮ মিলিয়ন ব্যারেল।

যুদ্ধ চলাকালীন তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে ক্রেতারা। রয়টার্স
অন্য কথায়, মার্চ এবং এপ্রিলের শুরুতে প্রণালিটি দিয়ে ইরানের রফতানি প্রকৃতপক্ষে বৃদ্ধি পেয়েছিল।
সহজ কথায়, যুদ্ধের আগের তুলনায় গত মাসে তেল রফতানি থেকে ইরান ৪০ শতাংশ বেশি আয় করেছে।
কিন্তু এখন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বন্দর এবং হরমুজ প্রণালি অবরোধ করায়, তেহরানের অপরিশোধিত তেল রফতানির ক্ষমতা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে – এবং বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই ক্ষতি মারাত্মক।
দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইরান তেল রফতানি করতে পারবে না, অন্তত আগের মতো পরিমাণে নয়।’ এরপর তিনি প্রণালি দিয়ে যেতে দেওয়া অ-ইরানি জাহাজগুলোর কাছ থেকে তেহরানের মাশুল আদায়ের খবরের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ইরানিরাও টোল আদায় করতে পারবে না।’
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার এই বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন যে, গত ছয় সপ্তাহ তেল রাজস্বের দিক থেকে ইরানের জন্য একটি আশীর্বাদস্বরূপ ছিল, কিন্তু মার্কিন অবরোধের কারণে পরিস্থিতি বদলে যাবে।
তিনি বলেন, ‘ভাসমান ট্যাঙ্কে, অর্থাৎ মূলত নোঙর করা ট্যাঙ্কারে, অপরিশোধিত তেলের মজুদের আকারে ইরানের কিছু বাড়তি সুবিধা রয়েছে, যার পরিমাণ ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১২৭ মিলিয়ন ব্যারেল বলে অনুমান করা হয়েছিল। কিন্তু এর মানে এই নয় যে এই অবরোধ ইরানের ক্ষতি করবে না।’
তেল ছাড়াও, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ তেহরানের অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্যকেও প্রভাবিত করতে পারে।
এর বন্দরগুলোর মাধ্যমে পাঠানো কিছু প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে পেট্রোকেমিক্যাল, প্লাস্টিক এবং কৃষি পণ্য, যা মূলত চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোতে যায়। অন্যদিকে, প্রধান আমদানি পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে শিল্প যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স এবং খাদ্য, যা মূলত চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং তুরস্ক থেকে আসে।
তেহরান টাইমসের ১৮ ফেব্রুয়ারির একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের শুল্ক প্রশাসন কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা গেছে যে, ২১ মার্চ, ২০২৫ থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশটির মোট তেল-বহির্ভূত বাণিজ্য ৯৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং আমদানি রফতানিকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘প্রশ্ন হলো, এই বর্ধিত দুর্ভোগ ইরানকে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য করবে, নাকি দেশটি তার সংকল্প আরও দৃঢ় করবে এবং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। তবে আমার সন্দেহ আছে যে এই অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর হবে বা খুব বেশিদিন স্থায়ী হবে।’
অবরোধের বিপরীতে ইরানের পদক্ষেপ কি?
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মোহসিন রেজাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে যদি যুক্তরাষ্ট্র ‘পুলিশের’ ভূমিকা পালন করতে চায়, তবে সেখানে মার্কিন জাহাজগুলো ডুবিয়ে দেওয়া হবে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ছবি: রয়টার্স
ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভিতে মোহসিন রেজাই বলেন, ‘ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে পুলিশ হতে চান। এটা কি আপনার কাজ? এটা কি যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী একটি সামরিক বাহিনীর কাজ?’
মোহসিন রেজাই সতর্ক করে বলেন, ‘আপনাদের জাহাজগুলো (অবরোধ কার্যকর করতে নজরদারি করা মার্কিন জাহাজ) আমাদের প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতেই ডুবতে পারে।’
এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় থাকা আরও একটি সুপার ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি হয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করেছে। এই প্রণালি ও ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ চলার মধ্যেই এ নিয়ে দ্বিতীয় মার্কিন নিষেধাজ্ঞাধীন ট্যাংকার হরমুজ পাড়ি দিল।
খালি অবস্থায় ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) ‘আরএইচএন’ বুধবার (১৫ এপ্রিল) পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে। জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা এলএসইজি ও কেপলারের তথ্যে এ খবর পাওয়া গেছে। ২০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল বহনে সক্ষম ট্যাংকারটি কোন দিকে যাচ্ছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা স্পষ্ট হওয়া যায়নি।
ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি বৃহস্পতিবার (১৫ এপ্রিল) জানিয়েছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানের একটি সুপার ট্যাংকার চলমান অবরোধ উপেক্ষা করে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়েছে। ট্যাংকারটি ইরানের ইমাম খোমেনি বন্দরের দিকে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ প্রণালি অবরোধ আসলে ইরানকে চাপে ফেলে নতি স্বীকার করানোর একটি কৌশল। কিন্তু ইতিহাস বলে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষরা যেমন ইরাক, আফগানিস্তান, রাশিয়া এবং লিবিয়া – তাদের জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে পশ্চিমা চাপের মুখে সহজে পরাস্ত হয় না।
ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। একের পর এক রাজনৈতিক দমনপীড়নের পরও এবং জনগণের শত দুর্ভোগ সত্ত্বেয় ইরানের কট্টরপন্থি সরকার তাদের সিদ্ধান্তে অবিচল থেকেছে। এই যুদ্ধে ইরানের হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। তেহরান হারিয়েছে তাদের শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় সব নেতাদের। এতকিছুর পরও শাসনব্যবস্থাটির টিকে থাকাটা সব যন্ত্রণা সহ্য করার সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
তাই বলা যায়, ইরানের নেতারা যেটিকে একটি অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছেন, তাতে যুক্তরাষ্ট্র আবারও নিজেদের সহনশীলতাকে অবমূল্যায়ন করছে। সিএনএন এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায় যে, ট্রাম্প বিশ্বাস করতেন মার্কিন-ইসরায়েলি আক্রমণ দ্রুত যুদ্ধের অবসান ঘটাবে – কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পরিস্থিতি ভিন্ন। ইরানকে যতই কোনঠাসা করা হচ্ছে ততই সে যেন আরও সংকল্পবদ্ধ এবং দুর্ভেদ্য হয়ে উঠছে।