Friday 21 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ট্রাম্পের খেয়ালি সিদ্ধান্তে বিশ্বে কমছে মার্কিন প্রভাব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৮ মার্চ ২০২৬ ১৮:৫৯ | আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২৬ ২৩:১৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

বারাক ওবামার প্রেসিডেন্সি পরবর্তী বছরগুলোতে এটি একটি ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল, সিরিয়ার ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা নিয়ে তার অবস্থান ছিল তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান ভুল। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, সিরিয়া রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করলে দেশটিতে হামলা চালানো হবে, কিন্তু যখন সেই অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ মিলল, তখন তিনি সামরিক হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্তটি কংগ্রেসের ওপর ছেড়ে দিলেন, যারা শেষ পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই সময় ওবামার এই সিদ্ধান্তকে একটি ‘বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ফ্লোরিডার তৎকালীন সিনেটর মার্কো রুবিও বলেছিলেন, এর ফলে আমেরিকার ‘প্রজন্মগত এবং মর্যাদাগত অপূরণীয় ক্ষতি’ হয়েছে। সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ব্যাখ্যা করেছিলেন, নিজের টানা ‘রেড লাইন’ নিজেই উপেক্ষা করে ওবামা বিশ্বজুড়ে আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করার ঝুঁকি নিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি, তার তুলনায় ওবামার সেই হুটহাট অবস্থান পরিবর্তনকে এখন অনেক বেশি ‘সুচিন্তিত নীতি-নির্ধারণী মডেল’ বলে মনে হয়।

গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছেন, ‘যদি ইরান আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোনো রকম হুমকি ছাড়াই হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণভাবে খুলে না দেয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে সেগুলো গুঁড়িয়ে দেবে এবং শুরুটা হবে সবচেয়ে বড়টি দিয়ে।’

গল্পের বাকি অংশটুকু এখন সবারই জানা। ইরান এই হুমকিতে দমে যেতে অস্বীকার করেছে এবং তাদের হামলা ও হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।

এর বিপরীতে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? তিনি দ্রুত নিজের অবস্থান থেকে সরে আসলেন এবং ঘোষণা করলেন, জ্বালানি অবকাঠামোতে যেকোনো হামলা ৫ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। তিনি দাবি করলেন, হঠাৎ করেই রাতারাতি ইরান ও আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে শত্রুতার ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত অবসানের’ লক্ষ্যে এক ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ চালাচ্ছেন।

ইরানিরা অবশ্য এ ধরনের কোনো আলোচনার কথা সরাসরি অস্বীকার করেছে। এখন ট্রাম্প বলছেন, তিনি এই স্থগিতাদেশ আরও দেড় সপ্তাহ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এটি এখন স্পষ্ট যে, ট্রাম্পের কাজগুলোকে কিছুটা নমনীয় বা বিশেষ ছাড় দিয়ে বিচার করা হচ্ছে। তিনি যখন বলেন, শুল্ক ১৩০ শতাংশ বাড়াবেন, কিংবা ইরানের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র উড়িয়ে দেবেন অথবা ‘যুদ্ধ মোটামুটি শেষ’ এইসব বক্তব্যের কোনোটিরই এখন আর তেমন কোনো বিশেষ অর্থ নেই।

এগুলো প্রকৃত মার্কিন নীতি হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে; কিংবা বড়জোর একদিন বা এক সপ্তাহের জন্য নীতি হিসেবে টিকে থাকতে পারে, যার পরেই আবার সব বদলে যাবে। যুদ্ধ প্রায় শেষ- এ কথা বলার ঠিক একই দিনে ট্রাম্প আবার দাবি করলেন, ‘আমরা এখনো যথেষ্ট জিতিনি এবং শত্রুকে সম্পূর্ণ ও চূড়ান্তভাবে পরাজিত না করা পর্যন্ত আমরা থামব না।’

তিনি জানাচ্ছেন, তিনি ইরানের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি ছিলেন, কিন্তু পারছেন না কারণ তারা একে একে মারা যাচ্ছেন। যদিও বাস্তবতা হলো তার নিজের বাহিনী (এবং ইসরায়েলই) তাদের হত্যা করছে। সব পরিষ্কার তো?

ট্রাম্পের সমর্থকরা দাবি করেন, এই অসংলগ্নতা আসলে তার এক বিশেষ ‘কৌশলগত প্রতিভা’, যার মাধ্যমে তিনি সবাইকে অপ্রস্তুত ও দ্বিধাদ্বন্দ্বে রাখেন। তবে বাস্তবতা হলো, তার নীতিগুলো বদলায় বিচিত্র সব কারণে: কখনো হয়তো শেয়ার বাজারে ধস নামলে, আবার কখনো হয়তো কোনো নির্দিষ্ট দেশ তাকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিলে কিংবা তাকে একটি সোনার বার উপহার দিলে।

তবে ট্রাম্পের আসল ‘সুপারপাওয়ার’ হলো, তিনি নিমিষেই নিজের অবস্থান বদলে ফেলার মতো যথেষ্ট নমনীয় এবং তার এমন এক জনসমর্থন (বেস) আছে যারা তার যেকোনো প্রস্তাবকেই নিঃশর্তে মেনে নেয়। যারা একসময় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিলেন, ট্রাম্পের সেই অনুসারীদের অনেকেই এখন নব্য ধর্মন্তরিতদের মতো প্রবল উৎসাহে এই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। ট্রাম্প যদিও স্পষ্ট করেছেন, তিনি এই শত্রুতার অবসান চান, কিন্তু সমস্যা হলো বাণিজ্যিক শুল্কের মতো এই যুদ্ধটি তিনি চাইলেই হুট করে থামিয়ে দিতে পারছেন না। কারণ, এই লড়াইয়ে ইরানেরও একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এবং ইরান বর্তমানে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পক্ষেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে; তাদের হিসেব হলো দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত হানার মতো যথেষ্ট সামরিক শক্তি তাদের আছে, যার মাধ্যমে তারা আমেরিকাকে চরম কষ্টে ফেলতে পারবে।

বিশ্বের কাছে এখন মার্কিন ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই; এটি এখন কেবলই একটি অদ্ভুত ‘রিয়েলিটি টেলিভিশন শো’তে পরিণত হয়েছে, যেখানে মূল অভিনেতা সংকটের মধ্য দিয়ে কখনও ডানে কখনও বামে মোড় নিচ্ছেন। ট্রাম্প আশা করছেন, আজ তিনি যা বলছেন, তা তার গতকালের বলা কথার ফলে সৃষ্ট সংকটের সমাধান দেবে।

ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার ঠিক আগের দিনই ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ‘গুটিয়ে নেওয়ার’ কথা ভাবছে। তিনি এমন ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালী রক্ষা করা তার সমস্যা নয় এবং যেসব দেশের আমদানিকৃত পণ্য এই প্রণালী দিয়ে যায়, তারাই এটি সামলাতে পারে। আবার অন্য এক সময়ে তিনি বলেছিলেন, তার অন্য কোনো দেশের সাহায্যের প্রয়োজন নেই।

ব্যবসায়ীরা একসময় আগের সরকারগুলোর বিরুদ্ধে নীতির অনিশ্চয়তা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করতেন। আর এখন সেই ব্যবসায়ীরাই লাইনে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের প্রশংসা করছেন, যদিও তার এই ‘বিশৃঙ্খলার উৎসব’ প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বাজারকে অস্থির করে তুলছে।

ট্রাম্প আমেরিকার বিশাল ক্ষমতা নিয়ে খেলায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন; যারা তার কাছে নতি স্বীকার করে না, তাদের তিনি শাস্তি দিচ্ছেন আর যারা মাথা নত করে, তাদের পুরস্কৃত করছেন। এটি করতে গিয়ে তিনি কয়েক দশক ধরে অর্জিত আমেরিকার আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বিলিয়ে দিচ্ছেন কেবল কিছু সাময়িক সুবিধা আদায়ের জন্য, যা অনেক সময় তার নিজের পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করে।

কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে তিনি এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছেন, যারা তার তৈরি করা নিয়ম অনুযায়ী খেলতে নারাজ।

[ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কলামিস্ট ফারিদ জাকারিয়ার কলামের ভাবানুবাদ]

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর