Saturday 22 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের এমডি পরিবর্তন শিগগিরই

আদিল খান স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২২ আগস্ট ২০২৬ ২২:০২

রাষ্ট্রায়ত্ব ৬ ব্যাংক। ফাইল ছবি

ঢাকা: দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম-দুর্নীতি, ঋণখেলাপি ও আর্থিক সংকটে জর্জরিত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংক। এবার সেই ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে আসতে পারে পরিবর্তন। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বিডিবিএল এবং বেসিক ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের আলোচনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনের বিষয়টি গত কয়েক মাস ধরেই আলোচনায় রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ঋণ বিতরণসহ ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে।

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সোনালী ব্যাংকে নেতৃত্ব সংকট চলছে। গত ২ মার্চ ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী পদত্যাগ করেন। এর পর প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও ব্যাংকটি পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান পায়নি। সাবেক আমলা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বর্তমানে চলতি দায়িত্বে ব্যাংকটির পর্ষদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

এদিকে চেয়ারম্যান পদে পূর্ণাঙ্গ নিয়োগ না হওয়া এবং এমডি পদে পরিবর্তনের আশঙ্কায় ব্যাংকটির কার্যক্রমেও একধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সোনালী ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বাড়ার পরিবর্তে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা কমেছে। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা। জুন শেষে তা নেমে এসেছে প্রায় ৯৬ হাজার কোটি টাকায়। অথচ একই সময়ে ব্যাংকটির আমানত ছিল প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংকটির ঋণ-আমানত অনুপাত বা এডি রেশিও ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, গত ছয় মাস ধরেই এসব ব্যাংকে নতুন এমডি নিয়োগের আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদেও পরিবর্তন আসতে পারে—এমন গুঞ্জন রয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় বর্তমান এমডি ও অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারাও বড় সিদ্ধান্ত নিতে অনেক ক্ষেত্রে সতর্ক থাকছেন। ফলে তাদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম অনেকটা রুটিননির্ভর হয়ে পড়েছে। আমানত সংগ্রহ, রেমিট্যান্স আহরণ, এলসি খোলা, সরকারি ঋণপত্রে বিনিয়োগ এবং সরকারি বিভিন্ন সেবা দেওয়াই ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমের বড় অংশ হয়ে উঠেছে। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের নতুন করে ঋণ দেওয়ার গতি তুলনামূলকভাবে কমে গেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এমডি ও পরিচালনা পর্ষদ গঠনের ক্ষেত্রে নিয়মনীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে। আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন এমডির রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ও সুবিধাভোগের বিষয় নিয়েও আলোচনা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সোনালী ব্যাংকের এমডি মো. শওকত আলী খান আগে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এমডি ছিলেন। একইভাবে জনতা ব্যাংকের এমডি মো. মজিবর রহমান আগে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে পরিবর্তন আসে। ড. আহসান এইচ মনসুরের স্থলে মো. মোস্তাকুর রহমান গভর্নরের দায়িত্ব নেন। পরে ডেপুটি গভর্নর পর্যায়েও পরিবর্তন আনা হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক পরিস্থিতির বড় দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে খেলাপি ঋণে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত নয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। এসব ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের ৪৫ দশমিক ২০ শতাংশই খেলাপি।

দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও যথাযথ যাচাই ছাড়া ঋণ বিতরণের কারণে কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক আর্থিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে জনতা ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। অগ্রণী, রূপালী, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকসহ অন্য সরকারি ব্যাংকগুলোতেও নানা ধরনের আর্থিক চাপ রয়েছে। তুলনামূলকভাবে সোনালী ব্যাংকের অবস্থান কিছুটা ভালো হলেও নতুন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকটির কার্যক্রমে বড় ধরনের ধীরগতি দেখা দিয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের চিত্রেও স্থবিরতা স্পষ্ট। রূপালী ব্যাংকের চলতি বছরের অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন—ছয় মাসে ব্যাংকটির ঋণ স্থিতি বেড়েছে মাত্র ৮৯২ কোটি টাকা। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর রূপালী ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ৫১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে একই সময়ে ব্যাংকটির বিনিয়োগ স্থিতি ২২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা হয়েছে। এই বিনিয়োগের বড় অংশই সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে। অর্থাৎ উদ্যোক্তা ও বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের পরিবর্তে সরকারি ঋণপত্রে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে ব্যাংকটি। এর মধ্যেই চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রূপালী ব্যাংক ৬১১ কোটি টাকা পরিচালন লোকসান করেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের চিত্রও একই। ব্যাংকটির তথ্যানুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ৮০ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে নতুন ঋণ বিতরণের মাধ্যমে ঋণ স্থিতি বাড়ার পরিবর্তে প্রায় ৪৯০ কোটি টাকা কমেছে।

ব্যাংকারদের মতে, শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা, খেলাপি ঋণের চাপ এবং ঋণ আদায়ে কঠোর হওয়ার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ বিতরণে সতর্কতা বেড়েছে। এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেছেন, ব্যাংক ঋণ কমার প্রধান কারণ ভালো ঋণ আদায়। প্রায় এক হাজার কোটি টাকা নগদ ঋণ আদায় হয়েছে। পাশাপাশি কাছাকাছি পরিমাণ ঋণ রাইট-অফ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক এখন খুবই রক্ষণশীল। যথাযথ ডিউ ডিলিজেন্স ও কেওয়াইসি ছাড়া ঋণ দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে। বর্তমানে নতুন প্রকল্পের পরিবর্তে বিদ্যমান ঋণ আদায় ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’ তার ভাষ্য, ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। পরিস্থিতির উন্নতি হলে কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়া বাড়ানো হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সারাবাংলাকে ব‌লেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। বর্তমানে ব্যাংকাররা ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগের সময়ে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকিং নীতিমালা ও নিয়ম মানা হয়নি। ফলে এখন ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের আগে ব্যাংকাররা প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করছেন। ভবিষ্যতে ঋণ বিতরণের কারণে যেন তাদের জবাবদিহির মুখে পড়তে না হয়, সে জন্য ঋণ কার্যক্রম কিছুটা ধীর হয়েছে।’

রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের এমডি পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে নয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) এমডি নিয়োগ ও পরিবর্তনের বিষয়টি দেখে।’ ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হচ্ছে পুরো আর্থিক খাত, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।’

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এমডি ও পর্ষদ পরিবর্তনের আলোচনা চলতে থাকায় ব্যাংকগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নতুন নেতৃত্ব এলে কোন নীতিতে ব্যাংক পরিচালিত হবে, সে বিষয়টিও কর্মকর্তাদের অনেকের কাছে পরিষ্কার নয়। তাদের মতে, দ্রুত চেয়ারম্যান, এমডি ও পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে সরকারের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে শীর্ষ ব্যবস্থাপনা নির্বাচন করা হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে গতি বাড়ানো সম্ভব হবে।

ব্যাংকগুলোর বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে নতুন নেতৃত্বের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে খেলাপি ঋণ আদায়, অনিয়ম বন্ধ, ঋণের মান উন্নত করা এবং বেসরকারি খাতে উৎপাদনশীল ঋণ বিতরণ বাড়ানো। ফলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এমডি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হলে তা শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কারের পাশাপাশি চেয়ারম্যান-এমডি পদে নতুন নিয়োগের বিষয়ে জানতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেককে একা‌ধিকবার ফোন কর‌লেও কোন সাড়া পাওয়া যায়‌নি। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত সরকারের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পদোন্নতি হয়েছে ঘুস ও দলীয় বিবেচনায়। এ কারণে যোগ্য কর্মকর্তারা ডিজিএম পদ থেকে উপরে উঠতে পারেননি। এখন ডিএমডিদের মধ্যে এমডি হওয়ার যোগ্য নির্বাহী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদেরও বিবেচনা করা হতে পারে। আর অতীতে এ ধরনের নজিরও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

আদিল খান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর