Thursday 02 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

গ্রেফতার-জামিনের ‘লুপহোল’ / বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা, দায় আসলে কার?

মেহেদী হাসান স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২ জুলাই ২০২৬ ২১:৩৬ | আপডেট: ২ জুলাই ২০২৬ ২১:৪৯

প্রতীকী ছবি। কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: রাজধানীসহ সারাদেশে অস্ত্রসহ কিংবা খুনের ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী, তালিকাভুক্ত মাদককারবারি, কিশোর গ্যাং সদস্য ও আধিপত্য বিস্তারকারী ছিনতাইকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে প্রায়ই গ্রেফতার হচ্ছে। কখনো কখনো তাদের এই রুদ্ধশ্বাস অভিযানে অপরাধীকে গ্রেফতার ও গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন- সাধারণ মানুষের মনে ক্ষণিকের স্বস্তি এনে দিচ্ছে। কিন্তু এই স্বস্তির আয়ু বড়জোর কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস।

কিছুদিন পরই দেখা যায়, সেই চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী, কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদার কিংবা তালিকাভুক্ত মাদক সম্রাট আইনের ফাঁক-ফোকর গলে জামিনে মুক্ত হয়ে বীরদর্পে চষে বেড়াচ্ছে পুরোনো এলাকা। অপরাধীদের এই ‘লুপহোল’ বা আইনি ফাঁক-ফোকর গলিয়ে বারবার বেরিয়ে আসার প্রবণতা দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অপরাধীদের এই অন্তহীন ‘জামিন বিলাসের’ পেছনে ত্রুটি ও দায় আসলে কার?- এমনই প্রশ্ন সাধারণ মানুষের।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে ২৯৪টি ছিনতাই, ৬০৫টি খুন, ১৯৬টি অপহরণ এবং ৩ হাজার ৪৯৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, গণধর্ষণের শিকার ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশু ৪৯ থেকে ৭১ জন।

অপরাধ বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুনের মামলার আসামি, মাদককারবারিরা, ডাকাত দলের সদস্য, প্রকাশ্যে কুপিয়ে হাতিয়ে নেওয়া ছিনতাইকারীরা ও অস্ত্রসহ সন্ত্রাসী এবং বেশির ভাগ অপরাধীই আগে গ্রেফতার হয়েছিলেন। পরে স্বল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বের হয়ে পুনরায় অপরাধকার্য সংগঠিত করছে। এমনকি অনেকে চার থেকে পাঁচবারও গ্রেফতার হওয়ার পর জামিনে বের হয়ে ফের অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দেশে-বিদেশে আলোচিত ওসমান হাদি হত্যা।

অস্ত্রসহ গ্রেফতারের তিন মাসের মধ্যে জামিনে বের হয়ে ওসমান হাদিকে হত্যা করে শুটার ফয়সাল। মিরপুরের আতঙ্ক ‘ভইরা দে’ গ্রুপের আশিকের বিরুদ্ধে ৩০টি মামলা থাকলেও বার বার জামিনে বের হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এমনই অসংখ্য অপরাধী ঘুরে বেড়াচ্ছে সারাদেশে এবং এসব কারণেই অপরাধের জন্য আলোচিত রাজধানীর মোহাম্মদপুরও অপরাধমুক্ত করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এদিকে, ‘জামিনে আসার পরে প্রতি সপ্তাহে ওসির কাছে এসে হাজিরা দিবে’- ফের অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা ঠেকাতে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি এমন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। কিন্তু সেটিও এখনো আলোর মুখ দেখেনি। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে একক কোনো পক্ষ নয়, বরং তদন্ত, প্রসিকিউশন এবং আইনি কাঠামোর একটি সমন্বিত দুর্বলতা কাজ করছে।

দুর্বল তদন্ত ও পুলিশের ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিট

তদন্তে জানা যায়, ফৌজদারি মামলার মূল ভিত্তি হলো পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিট। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, অপরাধীকে হাতেনাতে ধরার পরও আদালতে পর্যাপ্ত বস্তুগত তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয় পুলিশ। অনেক সময় গুরুতর অপরাধের মামলাতেও অজ্ঞাত কারণে বা আর্থিক-রাজনৈতিক প্রভাবে এমন সব ধারায় মামলা রুজু করা হয়, যা সহজেই জামিনযোগ্য। আর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা না পড়ায় আসামিপক্ষ আইনগত সুযোগ (ডিফল্ট বেইল) পেয়ে জামিন পেয়ে যায়। এমনকি, অদৃশ্য কোনো কারণে অনেক পুলিশ সদস্য গড়ে তুলছে সম্পদের সাম্রাজ্য।

আবার দেখা যায়, খুন, ডাকাতি ও ছিনতাই মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা বাদীকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে তাচ্ছিল্য করায় হতাশ হয়ে তারা আর এগোতে চায় না। মাসের পর মাস এবং বছরের পর বছর তদন্ত কর্মকর্তার পিছু ছুটতে থাকে বাদী। কিন্ত ব্যস্ততার কথা বলে সময়ক্ষেপণ করা হয় এবং ঝুলে থাকে চার্জশিট। অনেক সময় অপরাধীদের দ্বারা আর্থিকভাবে প্রশাসন প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ গণমাধ্যমে উঠে আসছে। আর এই সব কারণেও সহজেই জামিন পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা।

প্রসিকিউশনের অদক্ষতা ও জবাবদিহিতার অভাব

আদালতে রাষ্ট্র পক্ষে মামলা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকারি কৌঁসুলি বা প্রসিকিউটরদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত সমালোচিত। অনেক কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী বা সন্ত্রাসীর জামিন শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জোরালো কোনো বিরোধিতা করা হয় না। আবার পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে প্রসিকিউশনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নেই। ফলে অপরাধীর অপরাধের গভীরতা বা আগের অপরাধের রেকর্ড আদালতের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরা হয় না।

মামলার পাহাড় ও বিচারিক সীমাবদ্ধতা

দেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে বিপুল সংখ্যক মামলার জট রয়েছে। ছোটখাটো একটি মামলার বিচার শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে কোনো মামলার বিচার সম্পন্ন না হলে আসামি ‘দীর্ঘ হাজতবাসের’ গ্রাউন্ডে মানবিক কারণে জামিন পাওয়ার অধিকারী হন। অপরাধী যতই ভয়ংকর হোক, বিচারহীনভাবে তাকে অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখা যায় না। বিচার বিভাগের এই নীতিগত অবস্থানের সুযোগ নেয় অপরাধীরা। আদালত অনেক সময় ‘পুনরায় অপরাধে জড়াবে না’ বা ‘এলাকায় প্রবেশ করবে না’ এমন শর্তে জামিন দেন। কিন্তু জামিনে মুক্ত হওয়ার পর অপরাধী সেই শর্ত মানছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজম নেই।

অপরাধীদের জামিনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ

বাংলাদেশে অপরাধীদের জামিনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি প্রায় সময়ই গণমাধমে উঠে আসছে। কিন্তু চোখে পড়ার মতো নেই সমাধান। অপরাধীদের জামিনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে, সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং সমাজে অপরাধের হার বেড়ে যায়। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি বা মন্ত্রী-এমপিরা তাদের দলের কর্মীদের বাঁচাতে সরাসরি আদালত বা তদন্ত সংস্থাকে প্রভাবিত করেন। অনেক সময় রাজনৈতিক চাপে বাদীপক্ষ মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয় বা সাক্ষীরা সাক্ষ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

যা বলছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী

পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতার করছে আর তারা দ্রুত সময়েই জামিনে বের হয়ে বার বার অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। এখানে আইনের কী ত্রুটি বা দায়টা আসলে কার?- এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) নিয়াজ মেহেদী সারাবাংলাকে বলেন, ‘জুডিশিয়াল সিস্টেম বড় একটা লং প্রসেস। তার মধ্যে পুলিশ একটা পার্ট। আমরা শুধু তদন্ত ও প্রসিকিউশনের কাজগুলো করি। বাদবাকি কাজ আদালতের। এখানে আদালতসংশ্লিষ্ট অনেকেই আছেন। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনজীবীরা আছেন, বিচারকমণ্ডলী আছেন; তারা যদি মনে করেন যে জামিন হবে, তাহলে জামিন হবে। আর আমাদের দিক থেকে যেন কোনো গাফিলতি না থাকে, সে ব্যাপারে আমরা সচেষ্ট আছি।’

পুলিশের দিক থেকে চার্জশিট না দেওয়া বা যেভাবে অভিযোগ বা মামলাটা সাজানো উচিত সেটা অনেক সময় দুর্বল করে সাজানো হয়- এমন কোনো ত্রুটি দেখতে পান কিনা? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পুলিশের দিক থেকে ত্রুটি থাকার কথা না। কারণ, পুলিশ যখন একটা আসামিকে ধরে, তখন তার জামিন যেন না হয়- সে ব্যাপারে উল্লেখ করে তার পূর্ব যে কীর্তি আছে, অপরাধ আছে, সেটার একটা তালিকা দিয়ে সাধারণত আদালতে পাঠানো হয়। যখন আমরা রিমান্ডের আবেদন দিই, তখনো এই কথাটা থাকে। তো এদিক থেকে আমার মনে হয় না পুলিশের কোনো দায় আছে। যদি থাকে, তাহলে অবশ্যই ইম্প্রুভের সুযোগ আছে, ইম্প্রুভ করব আমরা। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেরও নির্দেশ যে, যখন তদন্তটা হয়, তখন যেন একেবারেই আইনের ভেতরে কোনো ফাঁক-ফোকর না থাকে, যাতে আসামিরা ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে না আসতে পারে। সে বিষয়ে আমরা সচেষ্ট আছি।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিনিয়ত হত্যা-অস্ত্র-মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধী গ্রেফতার করছে এবং তারা দ্রুত বার বার জামিনে বের হয়ে অপরাধ সংগঠিত করছে- এখানে ত্রুটি বা কোনো দায় আছে কিনা?- এ বিষয়ে সিআইডি’র মুখপাত্র বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের কাজ গ্রেফতার করা। গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা। এর পর আদালতের ডিসিশন। আদালতের ডিসিশনে আপনি-আমি কি কথা বলতে পারি? কমেন্ট করা কি উচিত? আর কারও দায় বা ত্রুটি আছে কিনা সেটা আমরা কী করে বলব? আমার কাজই হচ্ছে অ্যারেস্ট করা।’

তিনি বলেন, ‘আবার মানুষের জামিন পাওয়ারও অধিকার আছে। কারণ, আন্টিল অর আনলেস প্রুভেন গিল্টি, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রিজাম্পশন অফ ইনোসেন্স ডকট্রিন আছে। এটা তো আপনি জানেন- লিগ্যাল প্রিন্সিপাল, বেজ প্রিন্সিপাল। বিষয়টা এমন না যে, অনেকগুলো অর্গানাইজেশন এখানে লিঙ্ক হয়ে কাজ করে। প্রত্যেকের ফিল্ড নির্ধারণ করা আছে, ডিফাইন করা আছে। আমার অংশটা নিয়ে আমি কথা বলতে পারি, আরেকজনেরটা নিয়ে তো কথা বলতে পারি না।’

জসীম উদ্দীন খান আরও বলেন, ‘অপরাধীদের গ্রেফতার করি কারণ, সে ভবিষ্যতে ক্রাইম করবে না। কিন্তু এটা তো কাজ করছে না। সেজন্য এভাবেই আমাদের চলতে হবে, যেহেতু সিস্টেম এরকম। এখন এটাও যদি আপনি চেঞ্জ করতে চান, তাহলে ইউ নিড টু কন্ডাক্ট সুপিরিয়র রিসার্চ, ইন দ্য কনটেক্সট অফ আওয়ার ওন সোসাইটি, আওয়ার ওন কালচার।’

অভিযোগে বা তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্বল কিছু তথ্য দেওয়ায় জামিন হয়ে যায়- এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাহলে প্রসিকিউশন কী করে? প্রসিকিউশনের কাজটা তো আমার তদন্ত কর্মকর্তা যে রিপোর্টটা দেয়, সেটা ফিল্টারিং করবে। একটা কেস ফেইল করলে, কেন করল- সেটাও অ্যানালাইসিস করা তাদের দায়িত্ব। প্রসিকিউশনের তো একটা পুরো ডিপার্টমেন্টই আছে বাংলাদেশে। আনফরচুনেটলি মানুষে এই ডিপার্টমেন্টের কথা জানেই না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাজ হচ্ছে শুধুমাত্র আমার ইনকোয়ারি বা ইনভেস্টিগেশন করা। আমার কাছে মনে হচ্ছে যে, এই এভিডেন্স দিলে এটা বিয়ন্ড রিজনেবল ডাউট প্রুভ হবে কোর্টে। দেন আমি সেটা পাঠাই, প্রসিকিউশন সেটা যদি অ্যাপ্রুভ করে দেন এটা ট্রায়ালে যায়। এখানে আমাকে যে আইন শেখানো হয়েছে বা আমার দারোগাদের যে পদ্ধতি শেখানো হয়েছে, তারা ওটা ফলো করেই দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এখানে নেগলিজেন্সি থাকে, সেটার জন্য তার ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিউর, সুপারভাইজিং অফিসাররা থাকে, নানা ধরনের কন্ট্রোলে রাখে। এটা আমাদের ইন্টারনাল অনেক মেকানিজম আছে। কিন্তু যদি আমার সাফিসিয়েন্ট এভিডেন্স না থাকে, তাহলে তো সেই মামলা ট্রায়ালের জন্য সেন্ট আপ হওয়া উচিত না।’

এসব বিষয়ে র‌্যাবের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘ম্যান্ডেট অনুযায়ী এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে অপরাধীদের গ্রেফতারের ক্ষেত্রে র‍্যাব বদ্ধপরিকর। র‍্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়ন প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত অপরাধীদের গ্রেফতারের মাধ্যমে আইনের হাতে সোপর্দ করে যাচ্ছে। তাই, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে র‍্যাব সর্বাত্মক প্রচেষ্টা দিয়ে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে, আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে ধরনের সমস্যাগুলো বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে, সেগুলো সুনিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করতে পারবে যারা আইন ব্যবস্থা ও সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করছেন।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘হোরোইনসহ গ্রেফতারের পর দেখা যাচ্ছে সেটা আটা-ময়দা হয়ে যাচ্ছে।’ তবে কি অভিযোগ বা মামলা দুর্বল করে সাজানো হয়?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘র‍্যাব সব মামলার তদন্ত করে না। তদুপরি এটি নিশ্চিত করে বলা যায় যে, র‍্যাব যে সমস্ত মামলার তদন্ত করে, তা শতভাগ পেশাদারিত্ব এবং নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে।’

আইন বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ড. মুহাম্মদ ইউনুস আলী আকন্দ সারাবাংলাকে বলেন, ‘দেশের আইনের শাসনের দুর্বলতার কারণেই অপরাধ বাড়ছে। সেইসঙ্গে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে। হাদি হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত চার্জশিট হয়নি। হাদির মামলার আসামিরা ভারতে গ্রেফতার হলেও বাংলাদেশ তাদের দেশে আনতে পারেনি। সাগর-রুনী হত্যা মামলার বহু বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু, এখন পর্যন্ত সেই হত্যা মামলার চার্জশিট হলো না। কখনো দলীয় কারণে, কখনো সরকার পরিবর্তনের কারণে আসামিরা সরকারের দলীয় ছত্রছায়ায় জামিন পায়। জামিন পাওয়ার পর বিভিন্ন রকম অপকর্ম করে। রাজনৈতিক প্রভাবে অপরাধীরা সরকারের ছত্রছায়ায় অপরাধ করতে থাকে।’

এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকারের আইনের শাসন দ্রুত নিশ্চিত করা কথা জানান এই আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘সরকারকে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং দ্রুত বিচার সেটাও করতে হবে। আমাদের দেশে উচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগে এবং নিম্ন আদালতে বিচারক স্বল্পতার কারণে মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। মামলা দায়ের হয়, কিন্তু মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। মামলা নিষ্পত্তি করতে হলে নিম্ন আদালতে এখনই ১০০০ বিচারক নিয়োগ দিতে হবে। আবার হাইকোর্টেও এভাবে অন্তত ১০০ বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। আবার আপিল বিভাগে সপ্তাহে আগে তিনটা বেঞ্চ ছিল, এখন মাত্র একটা বেঞ্চ। এখানে সপ্তাহে পাঁচদিন কোর্ট বসে। আমার মনে হয়, মাসে একটা মামলাও ডিসপোজাল হয় না। শুধু টাইম আর টাইম, চার-পাঁচটা মামলা শোনে। নিম্ন আদালতও একই রকম।’

আইনের সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট তারাও টাকা-পয়সার নিয়ে অপরাধীদের পার করে দিচ্ছে।- এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা তো প্রমাণ করা খুবই কঠিন। কোন অপরাধী কাকে কাকে টাকা দিল, এটা তো নিশ্চিত করে বলা কঠিন। ফলে অপরাধীরা জামিন পায় এবং তারা যেকোনোভাবে পুলিশকে ম্যানেজ করে ফেলে। শুধু তাই নয়, সরকার দলীয় নেতাদের ছত্রছায়ায়ও অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।’

উল্লেখ্য, অপরাধ দমনে কেবল ‘গ্রেফতারের সংখ্যা’ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরং আইনের ফাঁক-ফোকর বন্ধ করে অপরাধীর চূড়ান্ত শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় দাবি।

সারাবাংলা/এমএইচ/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

মেহেদী হাসান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর