ঢাকা: ভোরের প্রথম আলো যখন ধীরে ধীরে ছুঁয়ে যায় রাজধানীর আকাশ, তখনই যেন অন্য এক জগতে রূপ নেয় রমনার বটমূল। চারদিকে লাল-সাদা পোশাকের মানুষের ঢল, মাথায় ফুলের সাজ, মুখে হাসি আর হৃদয়ে নতুন বছরের অনাবিল প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব উৎসবের আবহ। এই আবহেই সংগীত, আবৃত্তি আর বাঙালিয়ানার চিরন্তন রঙে নতুন বছরকে বরণ করে নেয় মানুষ।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে সম্মেলক কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানের মাধ্যমে শুরু হয়েছে বর্ষবরণের আয়োজন।
ছায়ানটের শিল্পীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হওয়া সেই সুর যেন একসঙ্গে হাজারো মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালিয়ে দেয়। এবারের প্রতিপাদ্য—‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’—শুধু একটি বাক্য নয়, বরং একটি প্রত্যয়, একটি আকাঙ্ক্ষা, যা নতুন বছরের প্রভাতে নতুন করে উচ্চারিত হয়।
রমনার বটমূলে দাঁড়িয়ে থাকা মানেই শুধু একটি অনুষ্ঠান দেখা নয়; এটি যেন এক অভিজ্ঞতা, যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মানুষের আবেগ একসূত্রে গাঁথা। ১৯৬৭ সাল থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজন আজও তার ঐতিহ্য অটুট রেখে বহমান। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এখানে এসে খুঁজে পায় নিজের শিকড়, নিজের পরিচয়।
আজকের আয়োজনে সাজানো হয়েছে বাংলা গানের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন সাঁই, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অজয় ভট্টাচার্য, আবদুল লতিফ, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের গান একে একে মঞ্চে পরিবেশিত হচ্ছে। লোকগানের সুরও মিলছে সেই ধারায়। মোট বাইশটি গানের মধ্যে আটটি সম্মেলক আর চৌদ্দটি একক কণ্ঠে পরিবেশিত হচ্ছে। পাশাপাশি আবৃত্তিও রয়েছে, যা গানের আবেশকে আরও গভীর করে তোলে।
ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে আসা মোহাম্মদ রফিক নামের এক দর্শনার্থী বলেন, ‘রমনার এই বটমূলে বসে যখন গান শুনি, মনে হয় যেন পুরো শহরটা থেমে গেছে, শুধু সুর বয়ে যাচ্ছে। এই মূর্ছনায় নতুন বছরকে বরণ করার অনুভূতিটা ভাষায় বোঝানো যায় না—এটা অনুভবের বিষয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী স্নেহা মণ্ডল বলেন, ‘বর্ষবরণের শুরুতে রমনায় ছায়ানটের এই পরিবেশটা বাঙালিয়ানার প্রকাশ। ছায়ানটের এই পরিবেশনা বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয় তুলে ধরে। ধর্ম, বর্ণ একপাশে রেখে নববর্ষের আয়োজন বাঙালি জাতীকে আরও ঐক্যবদ্ধ করুক সেটাই প্রত্যাশা করছি।’
প্রায় দুই শতাধিক শিল্পীর সম্মিলিত অংশগ্রহণে আজকের এই আয়োজন যেন এক বিশাল সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। শিশু বিভাগ থেকে শুরু করে প্রবীণ শিল্পী—সবাই মিলে তৈরি করেছেন এক সুরেলা পরিমণ্ডল, যেখানে প্রতিটি গান যেন নতুন দিনের প্রতিশ্রুতি বহন করে।
রমনার বটমূল আজ শুধু একটি স্থান নয়, এটি এক প্রতীক—অসাম্প্রদায়িক চেতনার, সাংস্কৃতিক ঐক্যের, আর বাঙালির চিরন্তন উৎসবপ্রিয়তার। এখানে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি—সব বিভাজন ভুলে মানুষ একত্রিত হয়, গানে গানে, হৃদয়ের টানে।
নতুন বছরের এই প্রথম প্রহরে রমনার বটমূল যেন বলে যায়—যত ঝড়-ঝাপটাই আসুক, বাঙালির গান থামে না, উৎসব থামে না, জীবন থামে না।