ঢাকা: সকাল হয়েছে মাত্র। ভেঙেছে কোকিলের ঘুম। শান্ত স্নিগ্ধ রমনার সবুজ চত্বরে সুমধুর সুরে সে জানান দিচ্ছে তার সরব উপস্থিতি। আর তার সঙ্গেই নতুন প্রভাতের নতুন আলোয় নতুন বছরকে বরণ করে নিল ছায়ানট।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) পয়লা বৈশাখ উপলক্ষ্যে রাজধানীর রমনা উদ্যানের বটমূলে ভোর সোয়া ৬টার দিকে যন্ত্রবাদনের মধ্য দিয়ে রমনার বটমূলে শুরু হয় ছায়ানটের বর্ষবরণ ১৪৩৩ এর অনুষ্ঠান।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন সাঁই, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অজয় ভট্টাচার্য, আবদুল লতিফ, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের গান দিয়ে অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছে। আরও রয়েছে লোকগান। আজকের আয়োজনে মোট ২২টি গান থাকছে।
সকালের স্নিগ্ধ প্রকৃতি এবং মানব ও দেশপ্রেমের গানের পাশাপাশি থাকছে লোক জনজীবনের সুর। বিশেষ সংযোজন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রখ্যাত গণসংগীতজ্ঞ সলিল চৌধুরী ও পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের দুর্দম গীতিকার-সুরকার মতলুব আলীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।

রমনা উদ্যানের বটমূলে বর্ষবরণ। ছবি: সারাবাংলা
এর মধ্যে ৮টি সম্মেলক গান, একক কণ্ঠের গান ১৪টি। পাঠ থাকছে দুটি। ছায়ানটের শিশু বিভাগের শিক্ষার্থীসহ সব বিভাগের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশিষ্ট শিল্পী মিলিয়ে প্রায় ২০০ শিল্পী অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন।
পয়লা বৈশাখকে বরণ করে নিতে প্রতিবারের মতো এবারো নগরবাসী ভিড় করছে রমনা উদ্যানে।
নববর্ষ উৎসবকে নির্বিঘ্ন করতে সকাল থেকেই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কড়া নিরাপত্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশের প্রতিটি পয়েন্টে ছিল পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যাপক উপস্থিতি। সকালে রমনা বটমূলের অনুষ্ঠানস্থলে আগতদের আসতে হয়েছে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনি পার হয়ে।
বিগত দিনের সব ‘প্রতিকূল আবর্জনা’ দূর করে ‘আরও মানবমুখী’ হওয়ার প্রত্যয় নিয়ে এবারও সুরের মূর্ছনায় বর্ষবরণ করে নিল আজন্ম বাংলা সংস্কৃতির চর্চা ও প্রসারে নিয়োজিত সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট।
ষাটের দশকে পাকিস্তানিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শহুরে আবহে রমনার বটমূলে প্রথম বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল ছায়ানটের হাত ধরে। সেই ধারাবাহিকতায় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন মঙ্গলবার ভোর সোয়া ৬টায়, রমনা বটমূলে নবীন আলোর সঙ্গে ছায়ানটের সুরবাণীছন্দের সূচনা হয়।
বর্ষবরণ অনুষ্ঠান ষাটের দশকে রমনার বটমূলে যে সূচনা করেছিল ছায়ানট, এখন তা বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। ১৯৬৭ সালে শুরু হওয়া এ উৎসব-আয়োজন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বছর ছাড়া প্রতিটি পহেলা বৈশাখেই হয়েছে; নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়েছে সুরের মূর্ছনা আর কথামালায়। কোভিডের দুবছর এ আয়োজন করা হয় ভার্চুয়ালি।

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কড়া নিরাপত্তা। ছবি: সারাবাংলা
২০০১ সালে ছায়ানটের বৈশাখ বরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। তাতে ১০ জন নিহত হন। এরপর থেকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেই প্রতি বছর বর্ষবরণের এ আয়োজন হচ্ছে।
রমনা উদ্যান থেকে দুই ঘণ্টার এই আয়োজন একযোগে সম্প্রচার করবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও প্রথম আলোর ওয়েব পোর্টাল এবং বিটিভি ও দীপ্ত টেলিভিশন।
ছায়ানটের ইউটিউব চ্যানেল (youtube.com/@chhayanautbd) ও ফেইসবুক পেইজেও (facebook.com/chhayanautbd) অনুষ্ঠান সরাসরি দেখা যাবে। বিলম্বিত সম্প্রচার করবে চ্যানেল আই টেলিভিশন।