রংপুর: রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল ও তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানের নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন তথ্য দিয়েছে ফরেনসিক বিভাগ। নিহতদের মুখ বিকৃত থাকলেও সেখানে কোনো রাসায়নিক পদার্থ বা অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়নি।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালে এ তথ্য জানিয়েছেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস।
রোববার (২৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
এর আগে, শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ ও সিআইডি কর্মকর্তারা গণমাধ্যমে বলেছিলেন, নিহতদের মুখমণ্ডলে দাহ্য পদার্থ পাওয়া গেছে এবং তা পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হবে।
ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা সবগুলো মরদেহই ময়নাতদন্ত করেছি। আমাদের কাছে মনে হয়েছে এটা শ্বাসরোধের মাধ্যমে মৃত্যু হয়েছে। মুখে রাসায়নিক পদার্থ বা অ্যাসিড দিয়ে ঝলসে দেওয়ার বিষয়টি পচে যাওয়ার কারণে এমন দেখা যাচ্ছে। কোনো অ্যাসিড বা অন্য কিছু ব্যবহারের চিহ্ন নেই।’
তিনি আরও জানান, ময়নাতদন্তে চোয়াল ভাঙার কোনো সাইন পাওয়া যায়নি। মরদেহ থেকে যেসব নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব, সেগুলো সিআইডি ল্যাবে পাঠানো হবে। সিআইডি ল্যাবের রিপোর্টের ভিত্তিতে চূড়ান্ত মতামত দেওয়া হবে।
চারজনের মৃত্যু শ্বাসরোধে
গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৩) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২) — সবার মৃত্যু শ্বাসরোধে হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করেছে ফরেনসিক বিভাগ।
ঘটনার বিবরণে পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাতে পাশের নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদ দিয়ে উঠে সিদ্ধার্থ দাস (২৩) ও মুগ্ধ দাস (১৯) ইয়াবা সেবন করছিল। ছাদে শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী সেখানে গেলে তাদের দেখে ফেলেন এবং বকাঝকা করেন। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে এবং মাদক সেবনের বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দেওয়ার আশঙ্কায় তারা তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়।
গামছা দিয়ে গলা প্যাঁচিয়ে ধরলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। শব্দ পেয়ে স্ত্রী প্রীতিলতা ছাদে এলে তাকেও একইভাবে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে মেয়ে আগামী এগিয়ে এলে তাকেও হত্যা করা হয়। সবশেষে, ঘরে থাকা ১২ বছরের ছেলে প্রিয়মকেও হত্যা করা হয়— কারণ তারা জানত, প্রিয়ম তাদের চিনতে পারে এবং ভবিষ্যতে ঘটনা ফাঁস করে দিতে পারে।
হত্যার পর যা করেছিল খুনিরা
পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ বাড়ির ওয়াশরুমে গোসল করে এবং সেখানে বসে আবারও ইয়াবা সেবন করে। তারা বাড়ির আসবাবপত্র তল্লাশি করে গহনা বের করে। সিদ্ধার্থ একটি স্বর্ণের দোকানে কাজ করায় আগুন দিয়ে গলিয়ে কোনটি আসল সোনা তা শনাক্ত করে। এছাড়া, তারা ডাইনিং টেবিলে বসে বয়ামে রাখা খেজুর খায় এবং মাদকের ভাব কমাতে ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খায়।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) জুমার নামাজের সময় লোকজন মসজিদে গেলে তারা পাশের বাড়ির ছাদ ঘুরে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। পরে তাদের গ্রেফতার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। রোববার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন এবং তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।