রংপুর: রংপুর নগরীতে নিহত অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষকসহ পরিবারের চার সদস্যের মুখই ঝলসানো ছিল। তাদের মুখমণ্ডল থেকে দাহ্য পদার্থ পাওয়া গেছে। পুলিশের ধারণা, হত্যার আগে বা পরে দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে তাদের মুখ ঝলসে দেওয়া হয়েছিল।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর দাসপাড়া (মাছুয়াপাড়া) এলাকার একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহতরা হলেন—রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৩) ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী (১২)।
রোববার (২৩ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে চারজনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পরে মরদেহগুলো দাহ করতে দখিগঞ্জ শ্মশানে নেওয়া হলে স্বজনেরা চারজনের মুখমণ্ডল ঝলসানো দেখতে পান প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যায় মরদেহগুলো হস্তান্তরের পর আমরা দেখতে পাই, তাদের মুখগুলো ঝলসানো। এর আগে পুলিশ আমাদের মরদেহের কাছে যেতে দেয়নি। তাদের হত্যার আগে বা পরে দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে মুখগুলো ঝলসে দেওয়া হয়েছিল। এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।’
রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানার ওসি নাজমুল কাদের বলেন, ‘নিহতদের মুখমণ্ডলে দাহ্য পদার্থ পাওয়া গেছে। নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’
রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী বলেন, ‘মরদেহগুলোর মুখমণ্ডল ঝলসানো ছিল। হত্যার আগে বা পরে হত্যাকারীরা দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে তাদের মুখ ঝলসে দিয়েছিল। দাহ্য পদার্থ হিসেবে কী ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে, তা আপাতত বলা যাচ্ছে না। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নমুনা সংগ্রহ করে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে পাঠালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিস্তারিত জানা যাবে।’
রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘প্রায় এক মাস আগে নিহত গণপতি চক্রবর্তী তার প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকা তুলেছিলেন। বাড়ির অসম্পূর্ণ কাজ শুরু করবেন বলে তিনি এই টাকা তুলেছিলেন। তিনি টাকা ব্যাংকে রেখেছিলেন নাকি বাড়িতে, তা বলতে পারব না।’
গণপতির বড় ভাই ও মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘গণপতি নগরীর দাসপাড়া (মাছুয়াপাড়া) এলাকায় নিজ বাড়িতে বসবাস করতেন। তিনতলা বাড়িটির দ্বিতীয় তলার কাজ শেষ হয়েছে। বাড়ির অসম্পূর্ণ কাজ শুরু করার কথা ছিল তার। তবে প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকা সম্পর্কে আমাকে কিছুই বলেনি। ব্যাংকে খোঁজ নিলে এ টাকার তথ্য পাওয়া যাবে। আমরা এখনও খোঁজ নিতে পারিনি।’
তিনি বলেন, ‘নিহতদের মুখমণ্ডল দাহ্য পদার্থ দিয়ে ঝলসে দেওয়ার তথ্য পুলিশ আমাদের জানায়নি। মরদেহ হাতে পাওয়ার পর আমরা তা দেখতে পাই। খুব কষ্ট দিয়ে আমার ভাই ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে।’
নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে নিহতদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তিনি।
দাসপাড়া এলাকার প্রবীণ ধীমান ভট্টাচার্য (৭০) বলেন, ‘পুলিশ যে তথ্য দিচ্ছে, আমরা সেটাই বিশ্বাস করছি। কারণ পুলিশ তদন্ত করছে। তবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি আরও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হলে আরও অনেক তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।’
এদিকে, এ ঘটনায় দুইজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের সময় ওই শিক্ষকের কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার পর তারা হত্যাকাণ্ড ঘটায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেফতার দুজন হলেন মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। সম্পর্কে তারা আত্মীয় এবং দুজনেরই বাড়ি নগরের কোতোয়ালি থানার মাছুয়াপাড়া এলাকায়। আজ ভোরে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘গত ২০ আগস্ট রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদ টপকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করে ইয়াবা সেবন করতে থাকে।
তিনি বলেন, ‘ছাদে মানুষের আনাগোনার শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী সেখানে যান। তিনি ছাদে দুই যুবককে দেখতে পেয়ে তাদের উপস্থিতির কারণ জানতে চান।’
পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ ওই এলাকারই বাসিন্দা এবং তারা ওই শিক্ষককে ‘স্যার’ বলে ডাকত। ধরা পড়ে যাওয়ায় তারা তাৎক্ষণিকভাবে গামছা গলায় পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। গণপতি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলে সেখানে ধস্তাধস্তি ও গোঙানির শব্দ হয়। এই শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী সিঁড়ি দিয়ে ছাদে ওঠার চেষ্টা করেন। খুনিরা তখন সিঁড়িতেই কাপড় পেঁচিয়ে তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করে। বাবা-মায়ের চিৎকারের শব্দে তাদের মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ঘর থেকে বেরিয়ে এলে তাকেও হত্যা করা হয়।’
আব্দুল মাবুদ বলেন, ‘পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রীয়মকে হত্যাকারীরা চিনত। সিদ্ধার্থের ছোট ভাই অপূর্বের সঙ্গে প্রীয়ম খেলাধুলা করত। খুনিরা বুঝতে পারে, প্রিয়ম বেঁচে থাকলে তাদের চিনে ফেলবে। তাই সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ মিলে শিশুটিকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে শেষে তারা বালিশ চাপা দেয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘টানা চারটি খুনের পর তাদের আচরণ ছিল স্বাভাবিক। খুনের পর তারা প্রথমেই ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খায়। এরপর ছোট ছেলে প্রীয়মকে যে রুমে মারা হয়, সেই রুমের বাথরুমে গিয়ে প্রথমে সিদ্ধার্থ এবং পরে মুগ্ধ গোসল করে। গোসল শেষে তারা ডাইনিং টেবিলে বসে। সেখানে রাখা বয়াম থেকে খেজুর বের করে খায় এবং সঙ্গে থাকা ইয়াবা সেবন করে।’