রংপুর: রংপুরে জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। নিজ বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়া ও প্রতিবাদ করায় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুর দেড়টায় রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আব্দুল মাবুদ এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য দেন।
পুলিশ কমিশনার জানান, মাদক সেবনকারীদের প্রতিবাদ করাই ছিল এই হত্যাকাণ্ডের একমাত্র কারণ। গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ও শান্ত প্রকৃতির মানুষ। তার পরিবারের সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ বা কলহ ছিল না।
হত্যাকাণ্ডের বিবরণ
গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পার্শ্ববর্তী বিল্ডিং থেকে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ নামে দুই মামাতো ভাই বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে তার বাসার ছাদে উঠে ইয়াবা সেবন করতে থাকে। তাদের বাড়ি মাছুয়াপাড়া এলাকায় বলে জানা গেছে। ছাদ থেকে শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী সেখানে যান। তিনি খালি গায়ে ছিলেন, কাঁধে ছিল একটি গামছা। তিনি তাদের নিজের ছাদে বসে আড্ডা দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে আসামিরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ না হওয়ার ভয়ে ওই গামছা দিয়েই তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে।
স্বামীর চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (ওরফে ভোলা) উপরে আসার চেষ্টা করলে আসামিরা তাকেও সিঁড়ির মধ্যে গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করে।
মায়ের চিৎকারে এগিয়ে আসা মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীকে (২৫) গামছা পেঁচিয়ে হত্যার চেষ্টা চালায় খুনিরা। প্রায় ৫ মিনিট ধরে তারা রশি দিয়ে তার গলা ও মুখ পেঁচিয়ে ধরে। এত জোরে টান দেওয়ায় তার চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখ বের হয়ে আসে।
সবাইকে হত্যার পর নিচে নামলে ছোট ছেলে প্রিয়ম (১২) তাদের চিনতে পারে বলে সিদ্ধার্থ সিদ্ধান্ত নেয়—তাকেও হত্যা করতে হবে। তারা নিষ্পাপ শিশুটির গলায় কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। লাশ পাওয়া যায় বিছানার নিচ থেকে।
হত্যার পর যা করেছিল খুনিরা
সকাল হলে তারা ওই বাড়ির বাথরুমে গোসল করে। ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর খায়। সেখানে বসেই আরও একটি ইয়াবা সেবন করে যা পুলিশ ইয়াবার আলামত উদ্ধার করেছে। জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা দেখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় তারা। সঙ্গে লুট করা মালামাল নিয়ে যায়।
পুলিশ কমিশনার জানান, খুনিরা ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে চালাতে ইচ্ছাকৃতভাবে বাসার জিনিসপত্র এলোমেলো করে রেখেছিল। বাড়ির দুইটি ফোন ডিটারজেন্ট দিয়ে পানিতে ভিজিয়ে রেখেছিল যেন কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট না থাকে।
কমিশনার জানান, খুনি সিদ্ধার্থ পি কে পাল জুয়েলার্সে আট বছর স্বর্ণের কাজ করেছে। সে আসল-নকল স্বর্ণ চিনতে পারে এবং আগুন দিয়ে পরীক্ষা করেছিল। এর থেকেই পুলিশ বুঝতে পারে খুনিদের মধ্যে স্বর্ণশিল্পী থাকতে পারে।
খুনিদের দেখানো মতে, তারা স্বর্ণালংকারসহ লুট করা মালামাল একটি মন্দিরের পেছনের পরিত্যক্ত বাড়ির জায়গায় লুকিয়ে রেখেছিল। পুলিশ তা উদ্ধার করেছে।
তিনি আরও জানান, মুগ্ধ দাস সিটি বাজারের রামনাথের মাছের দোকানে কাজ করে এবং সিদ্ধার্থ মুগ্ধের মামাতো ভাই, পেশায় স্বর্ণশিল্পী।
এদিকে সীমান্ত নামে একজনের নাম এসেছে তবে পুলিশ জানায় খুনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল না, তবে তার বাসায় বসে তারা ইয়াবা সেবন করেছিল। খুশি ওরফে প্রশান্ত নামে ইয়াবা ব্যবসায়ী, মুগ্ধের বাসার সামনে থেকে তারা প্রতি পিস ৩০০ টাকায় ইয়াবা কিনত।
পুলিশ কমিশনার জানান, সিদ্ধার্থের ছোট ভাই অপূর্ব প্রিয়মের সঙ্গে খেলাধুলা করত। প্রিয়ম খুনিদের চিনত। তাই পরিচয় প্রকাশ না হওয়ার জন্য সিদ্ধার্থ সিদ্ধান্ত নেয় প্রিয়মকেও হত্যা করতে হবে।
পুলিশ কমিশনার জানায়, এ ঘটনায় রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। খুনিদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এবং লুট করা মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও গ্রেফতারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।