Saturday 22 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

নীলফামারীতে বাল্যবিবাহের হার ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২২ আগস্ট ২০২৬ ১৫:০৪

নীলফামারী: আইন আছে, প্রশাসনের অভিযান আছে, সচেতনতামূলক প্রচারও চলছে। বাল্যবিবাহের খবর পেলে কোথাও ভ্রাম্যমাণ আদালত গিয়ে বিয়ে বন্ধ করছে, কোথাও নেওয়া হচ্ছে আইনি ব্যবস্থা। কিন্তু এত কিছুর পরও নীলফামারীতে বাল্যবিবাহের প্রবণতা থামছে না। বরং দারিদ্র্য, পারিবারিক চাপ, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়া এবং বয়সের তথ্য জালিয়াতির মতো নানা ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে গোপনে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সমস্যার আরও গভীর দিক হলো কোনো কিশোরীর বিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্ধ করা গেলেও তার পরবর্তী জীবন কতটা নিরাপদ ও স্বাভাবিক হচ্ছে, সে প্রশ্নের উত্তর অনেক ক্ষেত্রেই নেই। বিয়ে বন্ধের পর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ, পারিবারিক নিরাপত্তা, মানসিক সহায়তা, আর্থিক সহযোগিতা এবং পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় অনেক কিশোরীর ভবিষ্যৎ আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

ফলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রশাসনিক সাফল্য অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে রূপ নিচ্ছে না।

৪২.৪ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে ১৮ বছরের আগেই

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, নীলফামারী জেলায় ১৫ বছরের নিচে বাল্যবিবাহের হার ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। আর ১৮ বছরের নিচে বাল্যবিবাহের হার ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ।

অর্থাৎ জেলার প্রতি ১০ জন মেয়ের মধ্যে চারজনেরও বেশি মেয়েকে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হচ্ছে। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো কিশোরীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ।

আইন অনুযায়ী, মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। অথচ বাস্তব চিত্র বলছে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি যে সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামো বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করার কথা, সেখানেও রয়েছে নানা দুর্বলতা।

জন্মনিবন্ধনেই বদলে যাচ্ছে বয়স!

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বয়স প্রমাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল জন্মনিবন্ধন। কিন্তু এই জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থাকে ঘিরেই উঠছে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন।

অনুসন্ধানে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ পাওয়া গেছে, বিয়ের উপযুক্ত বয়স না হওয়া কিশোরীর জন্মনিবন্ধনের তথ্য অর্থের বিনিময়ে পরিবর্তন করে কাগজে বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি দেখানো হচ্ছে। পরে সেই জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে বিয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে।

অর্থাৎ বাস্তবে মেয়েটি অপ্রাপ্তবয়স্ক হলেও সরকারি কাগজে বয়স প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় বিয়েটি বৈধতার একটি আবরণ পাচ্ছে।

এখানেই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা সামনে আসে। জন্মনিবন্ধনের তথ্য যদি সহজেই পরিবর্তন করা যায় এবং পরিবর্তিত তথ্যের সঙ্গে অন্যান্য নথির সমন্বিত যাচাই না থাকে, তাহলে কাগজপত্রের আড়ালে বাল্যবিবাহ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জন্মনিবন্ধনের তথ্য যাচাই, বয়সের কাগজপত্র পরীক্ষা এবং বিয়ের আগে সংশ্লিষ্টদের যথাযথ সতর্কতার ঘাটতি থাকলে এ ধরনের জালিয়াতি আরও সহজ হয়ে ওঠে। তবে কারা এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত, কীভাবে তথ্য পরিবর্তন করা হচ্ছে, কত টাকার বিনিময়ে তা করা হচ্ছে এবং কতগুলো বিয়েতে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে প্রয়োজন নির্দিষ্ট ও কার্যকর তদন্ত।

নীলফামারী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আসাদুজ্জামান খান রিনো বলেন, ‘ভোটের কারণেই হোক কিংবা অভাবের কারণে, অনেকেই অসাধু উপায়ে জন্মনিবন্ধনে বয়স পরিবর্তন করে মেয়ের বয়স ১৮ বছর দেখিয়ে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। আমরা অনেক কমিটিতে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকায় সামাজিকভাবে কোথায় কী ঘটছে, তার সব তথ্য আমাদের কাছে সবসময় পৌঁছায় না। তবে এটি একটি উদ্বেগজনক বিষয়।’

দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক মানসিকতা

তবে বাল্যবিবাহের মূল কারণ শুধু জন্মনিবন্ধন জালিয়াতি নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দরিদ্র পরিবারের অনেক অভিভাবক মেয়েকে পরিবারের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। সংসারের ব্যয় কমানো, মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা ভবিষ্যতে ভালো পাত্র পাওয়া যাবে না এমন আশঙ্কা থেকে অল্প বয়সেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন তারা।

অনেক পরিবারে এখনো ধারণা, মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে পরিবারের একটি বড় দায়িত্ব শেষ। ফলে মেয়েটির নিজের ইচ্ছা, পড়াশোনা কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চেয়ে পারিবারিক সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়ে ওঠে।

এমনই এক কিশোরী জানান, মাত্র ১৪ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়ে যায়। তার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু অকাল বিয়ের কারণে সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপ নেওয়ার সুযোগ হয়নি।

আরেক কিশোরীর অভিজ্ঞতা আরও বেদনাদায়ক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী জানান, তার এক বান্ধবীর পরিবার জোর করে বিয়ের আয়োজন করেছিল। বিয়ে ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে হতাশায় ওই কিশোরী নিজের হাত ব্লেড দিয়ে কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত বিয়েটি ঠেকানো যায়নি; পরে তার খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়।

এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে শুধু আইন প্রয়োগের ঘাটতিই নয়, কিশোরীদের মতামত ও সিদ্ধান্তের অধিকারকেও কতটা উপেক্ষা করা হচ্ছে।

বিয়ে ঠেকানোর পরই কি শেষ প্রশাসনের দায়িত্ব?

বাল্যবিবাহ বন্ধ করা নিঃসন্দেহে একটি সাফল্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো এরপর কী? কোনো কিশোরীর বিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্ধ হওয়ার পর সে আবার পরিবারের কাছে ফিরে যায়। সেখানে যদি পরিবার তাকে পড়াশোনা করতে না দেয়, পুনরায় বিয়ের চাপ সৃষ্টি করে অথবা আর্থিক ও মানসিকভাবে তাকে একঘরে করে রাখে, তাহলে বিয়ে বন্ধের তাৎক্ষণিক সাফল্য কতটা টেকসই?

সুমনা আক্তারের অভিজ্ঞতা সেই প্রশ্নই সামনে আনে। নিজের বিয়েতে রাজি না হয়ে তিনি সাহস করে বিয়ে বন্ধ করতে সক্ষম হন। কিন্তু এরপর পরিবার তার পড়াশোনার খরচ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে বাল্যবিয়ে থেকে রক্ষা পেলেও শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পড়ে তার নিজের ওপর।

অর্থাৎ একটি কিশোরীর বিয়ে বন্ধ করা গেলেই তাকে নিরাপদ ভবিষ্যতের পথে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। প্রয়োজন হয় দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও নজরদারি। বিয়ে বন্ধের পর কিশোরীর শিক্ষা অব্যাহত রাখা, পরিবারকে কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা, প্রয়োজন হলে আর্থিক সহায়তা দেওয়া এবং পুনরায় বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না— তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

মাঠে কাজ করতে গিয়ে প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা

নীলফামারী জেলা প্রশাসন বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত, সচেতনতামূলক সভা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচারণা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় লোকবল ও লজিস্টিক সুবিধার ঘাটতি থাকায় সব এলাকায় সমানভাবে নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না।

নীলফামারী জেলা প্রশাসক ও জেলা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মো. নায়িরুজ্জামান বলেন, ‘বাল্যবিবাহ এখনো পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। সরকারি যে প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে কাজ হওয়ার কথা, সেখানে লোকবলের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে সব জায়গায় কার্যকর নজরদারি করা সম্ভব হয় না। আমরা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে কাজ করছি।’

একই সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের কর্মকর্তারাও। নীলফামারী জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের উপ-পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, ‘জনবল সংকট এবং লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে অনেক সময় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরা ভুক্তভোগীদের কাছে সময়মতো পৌঁছাতে পারি না। বিশেষ করে দুর্গম এলাকাগুলোতে বিয়ে বন্ধ করা গেলেও পরবর্তী ফলোআপ বা তদারকি করা কঠিন হয়ে পড়ে।’

বাল্যবিবাহের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুমাত্রিক

বাল্যবিবাহের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগুলোর একটি পড়ে কিশোরীর স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশে। অল্প বয়সে বিয়ে, এরপর দ্রুত গর্ভধারণ দুটিই একটি অপরিণত শরীরের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করে।

নীলফামারীর গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. ই. ইউ. রওশন আরা ইসলাম বলেন, ‘অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের ফলে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-একলাম্পসিয়া ও একলাম্পসিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। সময়ের আগে সন্তান জন্ম, অপুষ্ট শিশু জন্মগ্রহণ, প্রসবজনিত জটিলতা এমনকি মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়। তাই বাল্যবিবাহ শুধু আইনগত অপরাধ নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি।’

ফলে বাল্যবিবাহের ক্ষতি একটি মেয়ের জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না। অকাল মাতৃত্ব, অপুষ্টি, শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা ও মানসিক চাপের প্রভাব পড়ে পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও।

প্রশাসনের নজরদারি:

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রশাসনের তৎপরতা থাকলেও গত তিন বছরে মাত্র ১১টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করার তথ্য সামনে এসেছে।

এই সংখ্যা একদিকে প্রশাসনের হস্তক্ষেপের একটি পরিমাপ হলেও অন্যদিকে এটি নতুন প্রশ্নও তৈরি করে প্রশাসনের কাছে পৌঁছানো ১১টি ঘটনাই কি প্রকৃত চিত্র?

কারণ গ্রামাঞ্চলে অনেক বাল্যবিবাহ পরিবারের মধ্যেই গোপনে সম্পন্ন হয়। কোথাও রাতের আঁধারে, কোথাও বাড়িতে, আবার কোথাও বয়সের কাগজপত্র ঠিকঠাক দেখিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে দেওয়া হয়। ফলে প্রশাসনের অভিযানে বন্ধ হওয়া বিয়ের সংখ্যা দিয়ে জেলার প্রকৃত বাল্যবিবাহের চিত্র নির্ধারণ করা কঠিন।

বিশেষ করে ১৮ বছরের নিচে বাল্যবিবাহের হার যেখানে ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ, সেখানে তিন বছরে মাত্র ১১টি বিয়ে বন্ধ হওয়ার তথ্য প্রশাসনিক নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারে।

সমস্যার সমাধান শুধু অভিযানে

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও আইন প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন একই সঙ্গে প্রতিরোধ, নজরদারি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পুনর্বাসন।

প্রথমত, জন্মনিবন্ধনের তথ্য পরিবর্তনের প্রতিটি ঘটনা কঠোরভাবে যাচাই ও তদন্ত করতে হবে। বয়স জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা চক্র শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জন্মনিবন্ধনের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রেকর্ড, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য এবং বিয়ের নিবন্ধনের তথ্যের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা জরুরি। কোনো নথিতে বয়স পরিবর্তন হলে অন্য নথির সঙ্গে অসামঞ্জস্যতা সহজেই শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে আগেই শনাক্ত করতে হবে। দরিদ্র পরিবার, স্কুল থেকে ঝরে পড়া কিশোরী এবং যেসব পরিবারে অল্প বয়সে বিয়ের প্রবণতা রয়েছে, তাদের বিশেষ নজরদারিতে আনা প্রয়োজন।

চতুর্থত, বিয়ে বন্ধ হওয়ার পর কিশোরীকে পরিবারের হাতে ফিরিয়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ, প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা, মানসিক কাউন্সেলিং এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, কাজী, এনজিও, নারী সংগঠন ও অভিভাবকদের নিয়ে ইউনিয়নভিত্তিক কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বাল্যবিবাহের এই পরিস্থিতি আসলে একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। এখানে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, শিক্ষার সুযোগ, সামাজিক মূল্যবোধ, জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা-সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

একদিকে জেলার ১৮ বছরের নিচে বাল্যবিবাহের হার ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ, অন্যদিকে গত তিন বছরে প্রশাসনের হাতে বন্ধ হয়েছে মাত্র ১১টি বাল্যবিবাহ। এই দুই তথ্য পাশাপাশি রাখলে স্পষ্ট হয়, দৃশ্যমানভাবে বন্ধ হওয়া বিয়ের সংখ্যা দিয়ে সমস্যার গভীরতা বোঝা সম্ভব নয়।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের সাফল্য শুধু বিয়ের আসর ভেঙে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; সাফল্য তখনই আসবে, যখন একটি কিশোরী বিয়ে থেকে রক্ষা পাওয়ার পরও নিরাপদে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে, নিজের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাবে এবং পরিবার ও সমাজের চাপের কাছে আবার পরাজিত হবে না।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর