Friday 14 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

যানজট-জলাবদ্ধতা পেরিয়ে নতুন কুমিল্লা উপহার দেবে কুউক

মো. রাসেল, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৪ আগস্ট ২০২৬ ০৮:১৮ | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৬ ১০:৩০

কুমিল্লা সিটি। ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লা: বৃষ্টি হলেই সড়কে জমে পানি। কোথাও হাঁটুসমান জল, কোথাও আবার যানবাহনের দীর্ঘ সারি। সরু সড়কে বাড়তে থাকা যানবাহনের চাপ, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, পর্যাপ্ত ড্রেনেজের অভাব— সব মিলিয়ে প্রতিদিনই নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে কুমিল্লা নগরবাসীকে। বছরের পর বছর ধরে চলা এসব সমস্যা যেন নগরজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

তবে এবার সেই চিত্র বদলের স্বপ্ন দেখছে কুমিল্লার মানুষ। পরিকল্পনাহীন নগরায়নের লাগাম টেনে ধরে একটি সুপরিকল্পিত, আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কুউক)। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, চালু হয়েছে কার্যালয়ের কার্যক্রম। ফলে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার পর কুমিল্লার নগর উন্নয়নে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

২০১১ সালের ১০ জুলাই কুমিল্লা সিটি করপোরেশন গঠনের পর নগরবাসীর প্রত্যাশা ছিল নাগরিক জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। সময়ের সঙ্গে নগরের পরিধি ও জনসংখ্যা বাড়লেও অনেক মৌলিক সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি। প্রায় ৫৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ২৭টি ওয়ার্ডের এই নগরীতে জলাবদ্ধতা, যানজট, সংকীর্ণ সড়ক, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, ড্রেনেজ সংকট ও পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধার অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

নগরবাসীর অভিযোগ, বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। ফলে একটি এলাকায় উন্নয়ন হলেও অন্য এলাকায় তৈরি হচ্ছে নতুন সমস্যা। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা ও যানজটের মতো সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত নগর পরিকল্পনা।

এমন বাস্তবতায় কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের যাত্রাকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন নগরবাসী। তাদের প্রত্যাশা, কুউক শুধু নতুন রাস্তা বা ভবন নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং কুমিল্লার ভবিষ্যৎ নগরায়নকে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসবে।

মদিনা মসজিদ রোডের বাসিন্দা ফারহা ইমদাদ ইম্পা সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরকার কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করায় আমরা আনন্দিত। আমরা চাই এই কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কুমিল্লার পুরাতন গোমতী নদীকে হাতিরঝিলের আদলে তৈরি করা হবে। এ প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন হউক। কারণ, কুমিল্লা নগরবাসীর বিনোদন বা বেড়ানোর মতো কোনো জায়গা নেই। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে কুমিল্লার মানুষ হাঁটা-চলার পাশাপাশি বিনোদনের একটা জায়গা পাবে।’

নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসিন্দা জাকির হোসেন কাজল সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘কুমিল্লা নগরীতে উঁচু উঁচু বড় বড় অনেক বিল্ডিং দেখবেন। আমার প্রশ্ন— কয়টা বিল্ডিং ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়েছে? আমি চাই কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নতুন ভবন তৈরির অনুমতি দেওয়ার আগে ভবিষ্যৎ চিন্তা মাথায় রেখে অনুমোদন দিবেন। পাশাপাশি কুমিল্লার জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান করবেন।’

নগর পরিকল্পনার এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন গণমাধ্যমকর্মীরাও। এখন টেলিভিশনের কুমিল্লা ব্যুরো প্রধান খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, ‘কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যাত্রা শুরু করায় কুমিল্লার মানুষ অনেক বেশি আনন্দিত। কারণ, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কাজ করলে এখানকার দীর্ঘদিনের যে সমস্যা আছে তা কেটে যাবে। কুমিল্লা একটি প্রাচীন শহর। অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও শিক্ষায় এগিয়ে থাকা একটা শহর। কিন্তু সেই অনুযায়ী কুমিল্লা অনেক ঘনবসতি। কুমিল্লার রাস্তগুলো অনেক সরু। এই রাস্তাগুলোকে কীভাবে প্রস্থে বড় করা যায়, যানজট মুক্ত করা যায়, সে বিষয় নিয়েও কাজ করতে হবে।’

নগরবাসীর প্রত্যাশা, কুউকের কার্যকর উদ্যোগে কুমিল্লা ধীরে ধীরে একটি পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক নগরীর রূপ পাবে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, গুরুত্ব পাবে সড়ক ব্যবস্থাপনা, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা নিরসন, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নগরকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে তুলতে হলে শুধু বর্তমান সমস্যা সমাধান করলেই হবে না; আগামী কয়েক দশকের চাহিদা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করতে হবে। কোথায় আবাসিক এলাকা হবে, কোথায় বাণিজ্যিক এলাকা, কোন সড়ক কতটা প্রশস্ত হবে, কোথায় থাকবে পার্ক ও খেলার মাঠ, কীভাবে পানি নিষ্কাশন হবে— এসব বিষয়কে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

কুউক সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বাস্তবায়নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়। কারণ নগরবাসীর কাছে নতুন এই প্রতিষ্ঠান শুধু আরেকটি সরকারি সংস্থা নয়; বরং দীর্ঘদিনের নাগরিক দুর্ভোগ থেকে মুক্তির একটি সম্ভাবনা।

এরই মধ্যে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে উৎবাতুল বারি আবুকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চালু হয়েছে কার্যালয়ের কার্যক্রমও। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার পর পরিকল্পনা অনুযায়ী উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান।

কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উৎবাতুল বারি আবু সারাবাংলাকে বলেন, ‘কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সবেমাত্র সদ্য জন্ম নেওয়া একটি শিশুর মতো। আমরা এখন লোকবল নিয়োগে কাজ করছি। এর পর পরিকল্পনা মাফিক সবাইকে নিয়ে আধুনিক, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য একটি কুমিল্লা গড়ে তুলব ইনশাআল্লাহ। কারণ, আপনারা জানেন- বিগত বছরগুলোতে কুমিল্লায় তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। আমরা চাই সেই অভাব দূর করতে। কুমিল্লাকে আধুনিক কুমিল্লা হিসেবে গড়ে তুলতে।’

কুমিল্লার সামনে এখন তাই নতুন প্রশ্ন, কুউক কি পারবে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, যানজট ও অপরিকল্পিত নগরায়নের চিত্র বদলে দিতে? নগরবাসীর প্রত্যাশা, নতুন এই প্রতিষ্ঠান কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে কুমিল্লাকে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপ দেবে। আর সেই পরিবর্তনের অপেক্ষায় এখন পুরো কুমিল্লা।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর