Monday 13 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

হাতিয়ায় ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল, জেলেদের মানবেতর জীবন যাপন

ইকবাল হোসেন সুমন ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৩ জুলাই ২০২৬ ১২:২৯

ঘাটে বাঁধা জেলে নৌকা।

নোয়াখালী: নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল দেখা দিয়েছে। এসময়
প্রত্যাশিত মাছ না পেয়ে ২০টি ঘাটের ছোট-বড় প্রায় ১০ হাজার জেলে নৌকা নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই শূন্য হাতে ফিরছে। এতে জেলে, শ্রমিক, ব্যাপারী, আড়তদারসহ এই পেশার সঙ্গে জড়িত লক্ষাধিক মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে।

জেলেরা জানান, এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস চলে ইলিশের ভরা মৌসুম। প্রতি বছরের মতো এ বছরও নিঝুমদ্বীপ, বন্দরটিলা, সুইজের ঘাট, মোক্তারিয়া, দানারদোল, সূর্যমুখী, কাজিরবাজার, বাংলাবাজার ও চেয়ারম্যানঘাটসহ দ্বীপের ছোট – বড় ২০টি ঘাটের জেলেরা নদীতে মাছ শিকারে নামেন। তবে এবছর মৌসুমের বেশিরভাগ সময় পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

জেলেরা আরও জানান, নদীতে যেতে প্রতিদিন জ্বালানি ও খাবারের খরচ হয়। কিন্তু আয় না থাকায় আর্থিক দেনা দিন দিন বাড়ছে। অনেকেই পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। মাছ না পাওয়ায় ঘাটগুলোতে আগের মতো হাঁকডাক নেই। জেলেদের মাঝে নেমে এসেছে নীরবতা ও হতাশা।

উপজেলার সূর্যমুখী ঘাটের জেলে আলী মিয়া বলেন, তার বাড়ি পাশের জেলা ভোলার দৌলতখাঁ উপজেলায়। বেশি মাছ পাওয়ার আশায় তিনি হাতিয়ায় এসে মাছ শিকার করছেন। মৌসুমের শুরু থেকে তিনি এখানে অবস্থান করছেন। তার ট্রলারের ১০ মাঝি-মাল্লার বাড়িও একই এলাকায়।

উপার্জনের অবস্থা সম্পর্কে আলী মিয়া বলেন, এ বছর পরিস্থিতি খুবই খারাপ। দেড় মাস আগে এলেও এখনো এক টাকাও বাড়িতে পাঠাতে পারেননি। তার পাঁচ সদস্যের সংসার খেয়ে-না-খেয়ে চলছে। মোবাইলে কথা হলে পরিবারের সদস্যরা টাকা পাঠাতে বলে, কিন্তু তার কিছুই করার নেই। গত দেড় মাসে তাদের নৌকাটি বেশ কিছু টাকার দেনায় পড়েছে বলেও জানান তিনি।

কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় ঘাটগুলোতে কর্মচাঞ্চল্যও কমে গেছে। অনেক ব্যবসায়ী কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারছেন না। ঘাট শ্রমিকদের সংসারও চলছে কষ্টে।

সূর্যমুখী ঘাটে জেলেদের নৌকা থেকে ডাকের বাক্সে মাছ টানার কাজে ৫০ জন শ্রমিক রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, তাদের অনেকে নির্দিষ্ট পোশাকে টুকরি নিয়ে খালপাড়ে জেলে নৌকার অপেক্ষায় বসে আছেন।
শ্রমিক নবির সর্দার বলেন, ‘প্রতিদিন মাছ টানার পর যে টাকা পাওয়া যায়, তা ৫০ জনে ভাগ করে নিই। এতে কোনো দিন ২০০ টাকা, আবার কোনো দিন তার চেয়েও কম পাই। এই আয়ে সংসার চলে না বলে অনেকেই অন্য পেশায় চলে গেছেন।’

নবির সর্দার আরও বলেন,‘ মৌসুমের অর্ধেক সময় পার হয়ে গেলেও এখনো পর্যাপ্ত মাছ ধরা পড়ছে না। এতে অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বাড়িতে চলে গেছেন। অনেক জেলেও তাদের নৌকা ঘাটে বেঁধে রেখেছেন।’

হাতিয়া সূর্যমুখী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি জবিয়ল হক বলেন, ‘হাতিয়ার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ৭ লাখ ৫০ হাজার লোকের বসবাস। এখানে জেলে পেশার সঙ্গে জড়িত প্রায় লক্ষাধিক মানুষ রয়েছেন। নদীতে মাছ ধরা না পড়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। অনেক জেলে পরিবার অনাহারে জীবন যাপন করছে।’

জবিয়ল হক আরও বলেন, ‘৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর হাতিয়ার ২০টি ঘাটে ছোট-বড় প্রায় ১০ হাজার জেলে নৌকা নিয়ে নদীতে নামে। কিন্তু মাছ না পাওয়ায় প্রতিটি ঘাটেই অর্ধেক নৌকা নদীতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। যারা যাচ্ছে, তারাও প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হচ্ছে। সারাদিন নদী থেকে অনেক নৌকা বিকেলে ৪-৫টি ছোট মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরছে, কিছু নৌকা তাও পাচ্ছে না।’

উপার্জন না থাকায় অনেক জেলে মালিককে না জানিয়ে গোপনে বিভিন্ন জায়গায় চলে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান বলেন, ‘ভরা মৌসুমে ইলিশ না পাওয়ার কারণ জাটকা নিধন, মা ইলিশ ধরা, ডুবোচর, নদীদূষণ ও জলবায়ুর পরিবর্তন। সেই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকার কলকারখানার বর্জ্য নদীতে আসায় মাছের বিচরণ অনিরাপদ হয়ে উঠছে। তবে মৌসুমের সামনের সময়ে কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়ার আশা রয়েছে।’

সারাবাংলা/এএ
বিজ্ঞাপন

আরো

ইকবাল হোসেন সুমন - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর