Saturday 11 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

কক্সবাজারে ভয়াবহ ডেঙ্গুর প্রকোপের শঙ্কা, ঝুঁকিতে লাখো রোহিঙ্গা

মো. নেজাম উদ্দিন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১১ জুলাই ২০২৬ ১২:১২ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬ ১২:৩০

এডিস মশা। ছবি: সারাবাংলা

কক্সবাজার: টানা ভারী বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যায় কক্সবাজারের ৯টি উপজেলা প্লাবিত হওয়ার পর নতুন করে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গুর ভয়াবহ শঙ্কা। শনিবার (১১ জুলাই) অধিকাংশ এলাকা থেকে বন্যার পানি নেমে গেলেও নিচু অঞ্চল, ড্রেন, খাল এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহে জেলায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরবর্তী দুই থেকে তিন সপ্তাহ ডেঙ্গু বিস্তারের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। কারণ এ সময় জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে এবং দ্রুত বংশবিস্তার করে।

বিজ্ঞাপন

পর্যটন খাতে নতুন শঙ্কা

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত ঘিরে গড়ে ওঠা কক্সবাজারের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি পর্যটন শিল্প। তবে বন্যার পর যদি ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ে, তাহলে পর্যটন খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

তাদের মতে, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে পরিবার নিয়ে পর্যটকদের কক্সবাজারে আসার আগ্রহ কমে যাবে। এতে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের অগ্রিম বুকিং বাতিল হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।

পর্যটন ব্যবসায়ী মুকিম খান বলেন, ‌‘বন্যার কারণে কয়েকদিন ধরেই পর্যটক কম ছিল। এখন যদি ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করা।’

রোহিঙ্গা ক্যাম্প।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দ্বিগুণ উদ্বেগ

উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ১২ লাখ মানুষের বসবাস। ঘনবসতি, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানির কারণে এসব ক্যাম্পে ডেঙ্গুর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

স্থানীয়দের মতে, অতীতেও সামান্য বৃষ্টির পর ক্যাম্পে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছিল। এবার বন্যার পর অনেক স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ফলে ক্যাম্পে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বছরের শুরু থেকেই আতঙ্কের নাম ডেঙ্গু

কক্সবাজার জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের বিগত বছরগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, বর্ষা ও বর্ষা পরবর্তী সময়ে জেলা জুড়ে, বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল আশঙ্কাজনক। গত বছরগুলোতেও হাজার হাজার মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং বেশ কয়েকজনের প্রাণহানিও ঘটেছিল। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজারে মোট ৬৪৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৭৬ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ৪৭১ জন রোহিঙ্গা।

একই সময়ে স্থানীয়ভাবে শনাক্ত হওয়া ১৭৬ রোগীর মধ্যে ২ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে ১৫ জন চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের মধ্যে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ১১ জন, উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুইজন এবং মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুইজন ভর্তি ছিলেন।

সেদিনই ১০ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়েন এবং নতুন করে ভর্তি হন পাঁচজন। নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে চারজনই উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা এবং একজন মহেশখালীর।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে আক্রান্তদের বড় অংশই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ বাড়তি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা পঙ্কজ পাল বলেন, স্থানীয়ভাবে ১৭৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যু হয়নি। এটি স্বস্তির বিষয় হলেও পরিস্থিতি নিয়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই।

হামের পাশাপাশি ডেঙ্গুর চাপ

স্বাস্থ্য বিভাগের সূত্র জানায়, শীতকাল থেকে শুরু হওয়া হামের সংক্রমণ এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। প্রতিদিনই হামের পাশাপাশি ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়েও রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সারা বছরই ডেঙ্গুর সংক্রমণ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি থাকে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সম্ভাব্য ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। দ্রুত ড্রেন পরিষ্কার, জমে থাকা পানি অপসারণ, লার্ভিসাইড ও মশকনাশক স্প্রে কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

তাদের মতে, বাসাবাড়ি, হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের আশপাশে কোথাও যেন তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে মশারির ব্যবহার, পরিচ্ছন্নতা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে কাজ করলে কক্সবাজারকে সম্ভাব্য ডেঙ্গু সংকট থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর