Tuesday 07 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

যমুনার ভাঙনে গৃহহীন শতাধিক পরিবার, ঝুঁকিতে মাদরাসা ভবন

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৭ জুলাই ২০২৬ ২০:০৩ | আপডেট: ৭ জুলাই ২০২৬ ২০:১২

নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে চরকালিকাপুর শুকুরিয়া দাখিল মাদ্রাসা

মানিকগঞ্জ: জেলার দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নে যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বসতভিটা ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। একই সঙ্গে নদীভাঙনের মুখে পড়েছে ওই চরাঞ্চলের একমাত্র মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চরকালিকাপুর শুকুরিয়া দাখিল মাদরাসা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক দিনের ভাঙনে বাঘুটিয়া ইউনিয়নের ব্রাহ্মন্দীসহ আশপাশের এলাকায় শতাধিক বসতভিটা নদীগর্ভে চলে গেছে। অনেক পরিবার আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ কেউ খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের একজন ব্রাহ্মন্দী গ্রামের শান্তি বেগম (৭০)। জীবনে ৩ বার যমুনার ভাঙনে ঘর হারিয়েছেন তিনি। প্রায় ২০ বছর আগে নতুন করে গড়া বাড়িটিকেই শেষ আশ্রয় ভেবেছিলেন। কিন্তু রোববার গভীর রাতে যমুনার স্রোত সেটিও কেড়ে নেয়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শান্তি বেগম বলেন, ‘তিনবার নদী আমার ঘর নিয়ে গেছে। ভাবছিলাম, এবার হয়ত আর ভাঙবে না। কিন্তু শেষ সম্বলটাও চলে গেল। এখন কোথায় থাকব, কীভাবে চলব, কিছুই জানি না।’

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙনের আশঙ্কায় অনেকে ঘর খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। আবার অনেকের ঘরবাড়ি কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

নদীভাঙনের সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে রয়েছে চরকালিকাপুর শুকুরিয়া দাখিল মাদরাসা। ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে মাদ্রাসার সীমানাপ্রাচীর ও টয়লেট। ৪ তলা একাডেমিক ভবনটি এখন নদী থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মাদরাসার দুটি ভবনও নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। চরাঞ্চলের কয়েকটি গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য এটিই একমাত্র মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

স্থানীয় বাসিন্দা চাঁন মিয়া বলেন, ‘এ এলাকায় আর কোনো হাইস্কুল নেই। মাদরাসাটি নদীতে চলে গেলে শত শত শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে কাছের স্কুলটি তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে। সেখানে যেতে নদী পার হতে হয়, যা অনেক পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়।’

মাদরাসার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘মাদরাসাটি না থাকলে আমাদের অনেকেরই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে। দূরের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ সবার নেই।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যমুনা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। এতে ভাঙনের তীব্রতাও বেড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা হারুনুর রশিদ বলেন, ‘বহুবার অভিযোগ করেও অবৈধ ড্রেজিং বন্ধ করা যায়নি। এখনো নদীর দক্ষিণ দিকে বালু তোলা হচ্ছে। এতে ভাঙন আরও বেড়ে গেছে।’

ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মোসা. নুরুন্নাহার বলেন, ‘ঘরের সবকিছু নদীতে চলে গেছে। প্রতিবেশীদের সহায়তায় শুধু কয়েকটি হাঁড়ি-পাতিল বের করতে পেরেছি।’

রহিমা বেগম বলেন, ‘রাতে বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। বড় বড় মাটির অংশ নদীতে ভেঙে পড়ছিল। কিছু সরানোর আগেই ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু নদীতে চলে যায়।’

ভাঙন ঠেকাতে মাদরাসার সামনে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে স্থানীয়দের দাবি, এটি সাময়িক ব্যবস্থা। স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ না করলে ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে না।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান সারাবাংলাকে বলেন, ‘চরাঞ্চলটি সম্পূর্ণ বালুময়। তাই প্রতিবছরই ভাঙনের ঝুঁকি থাকে। স্থায়ী সমাধানের জন্য আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করতে হবে। এরপর দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন প্রকল্প নেওয়া সম্ভব হবে। আপাতত মাদরাসা রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।’

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত স্থায়ী নদীশাসন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া না হলে দৌলতপুরের এই চরাঞ্চলে সংকট আরও বাড়বে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর