সিরাজগঞ্জ: স্বল্প সময়ে বেশি মুনাফার প্রলোভন, ভুয়া অনলাইন অ্যাপস, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ এবং পরে অ্যাপস বন্ধ করে দেওয়ার অভিনব কৌশলে সিরাজগঞ্জের শতাধিক মানুষের কাছ থেকে প্রায় ২১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আব্দুল হামিদ (৩৩) নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা টাকা ফেরত চাইলে তিনি কখনও নতুন অ্যাপসে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন, আবার কখনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে ‘জিনের বাদশা’ পরিচয় দিয়ে ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার পর অভিযান চালিয়ে সোমবার (১ জুন) রাতে সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার বনবাড়ীয়া গ্রাম থেকে আব্দুল হামিদকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তিনি ওই গ্রামের মৃত আব্দুল করিমের ছেলে। মঙ্গলবার (২ জুন) দুপুরে সিরাজগঞ্জ সদর থানার সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নাজরান রউফ।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আব্দুল হামিদ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনলাইন অ্যাপস ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে আসছিলেন। তিনি দাবি করতেন, নির্দিষ্ট অ্যাপসে টাকা জমা রাখলে অল্প সময়ের মধ্যে কয়েকগুণ লাভ পাওয়া যাবে। তার কথায় বিশ্বাস করে অনেকেই নগদ, বিকাশসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে টাকা পাঠাতেন।
প্রাথমিকভাবে তিনি ‘ইকো ভোল্ট’ নামের একটি কথিত সোলার প্যানেলভিত্তিক বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মের প্রচারণা চালান। গ্রাহকদের বোঝানো হতো, সেখানে টাকা জমা রাখলে নিয়মিত কমিশন ও মুনাফা পাওয়া যাবে। প্রথমদিকে কিছু গ্রাহককে সামান্য অর্থ ফেরত দিয়ে আস্থা অর্জন করা হয়। এরপর আরও বেশি মানুষকে যুক্ত করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়।
মামলার বাদী মমতাজ বেগমের মাধ্যমে প্রায় ১০০ গ্রাহক ওই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন। তাদের কাছ থেকে ধাপে ধাপে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজরান রউফ বলেন, ‘ইকো ভোল্ট অ্যাপসের মাধ্যমে প্রায় ১১ লাখ টাকা সংগ্রহ করার পর এক পর্যায়ে অ্যাপসটি অকার্যকর হয়ে যায়। গ্রাহকেরা লগইন করতে গিয়ে দেখতে পান, অ্যাপসটি সাদা স্ক্রিন দেখাচ্ছে এবং আর কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি জানান, এ ঘটনার পরে বিনিয়োগকারীরা হামিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বিষয়টিকে সাময়িক প্রযুক্তিগত সমস্যা বলে দাবি করেন। পরে ‘সিইএফ’ (CEF) নামে নতুন একটি অ্যাপসে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। সেখানে আরও বেশি লাভের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নতুন করে টাকা সংগ্রহ শুরু করেন।
পুলিশের তথ্যমতে, দ্বিতীয় ধাপে সিইএফ অ্যাপসের মাধ্যমে প্রায় ৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে সেই অ্যাপসও অকার্যকর হয়ে গেলে নতুন নতুন প্রলোভন দেখিয়ে আরও প্রায় ৪ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়।
সবমিলিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে প্রায় ২১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে এসেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে যখন তারা টাকা ফেরতের দাবি জানান, তখন আব্দুল হামিদ সরাসরি যোগাযোগ এড়িয়ে যেতে শুরু করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে ‘Hamkail Moakael’ নামে একটি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নিজেকে ‘জিনের বাদশা’ হিসেবে পরিচয় দেন।
গ্রাহকদের ভয় দেখিয়ে তিনি দাবি করতেন, তার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে গেলে ক্ষতি হবে। কেউ কেউ হুমকি ও ভয়ভীতির কারণে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতেও সাহস পাননি বলে জানা গেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতারণার পাশাপাশি ভয় সৃষ্টি করে ভুক্তভোগীদের দমিয়ে রাখার একটি কৌশল হিসেবেও এই পরিচয় ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
মামলার বাদী মমতাজ বেগম বলেন, ‘প্রতারণার এই চক্রের অন্যতম লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ এলাকার সহজ-সরল ও পর্দানশীন নারীরা। অনেক নারী স্বামী বা পরিবারের অজান্তে সঞ্চিত টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। হামিদ এ বিষয়টি জানতেন। তাই তিনি মনে করতেন, টাকা হারালেও সামাজিক সংকোচ ও লোকলজ্জার কারণে অনেকেই থানায় অভিযোগ করতে আসবেন না।’
মমতাজ বেগমের দাবি, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা চালিয়ে আসছিলেন হামিদ।
বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতারণার অর্থে আব্দুল হামিদ সলঙ্গা এলাকায় প্রায় ৫৪ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া, নামে ও বেনামে তার একাধিক ব্যাংক হিসাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব সম্পদের উৎস তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। তাদের মতে, অনলাইন প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা হয়ে থাকতে পারে।
তবে জমি ও ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য নিশ্চিত করেনি। তদন্তের মাধ্যমে বিষয়গুলো যাচাই করা হবে বলে জানিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
পুলিশ জানায়, মামলা দায়েরের পর সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় সদর থানার একাধিক টিম অভিযানে নামে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার, গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে অভিযুক্তের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়।
পরে সোমবার রাতে বনবাড়ীয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
তার কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত একটি স্মার্টফোন, একটি ট্যাব, বিভিন্ন অ্যাপসের প্রচারসংক্রান্ত লিফলেট ও কাগজপত্র জব্দ করা হয়েছে। এসব আলামত পরীক্ষা করে প্রতারণার নেটওয়ার্ক, অর্থ লেনদেনের ধরন এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনলাইনভিত্তিক বিনিয়োগ, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ই-কমার্স, সোলার প্রজেক্ট এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নামে প্রতারণার ঘটনা বেড়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিক মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। প্রথমদিকে কিছু লাভ দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জন করা হলেও পরে অ্যাপস বা ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের আইনানুগ অনুমোদন, নিবন্ধন, ব্যবসার প্রকৃত কার্যক্রম এবং আর্থিক কাঠামো যাচাই না করে বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ। অল্প সময়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ লাভ ধরনের প্রতিশ্রুতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতারণার ইঙ্গিত বহন করে।
এদিকে ভুক্তভোগীরা অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার, আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধার এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং প্রতারণার সঙ্গে জড়িত অন্য কেউ থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।