Sunday 31 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

পদ্মায় বালু উত্তোলনের অভিযোগ, ভাঙনঝুঁকিতে ৫ হাজার বসতবাড়ি

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৩১ মে ২০২৬ ২০:১৭

পদ্মা থেকে বালু উত্তোলন।

শরীয়তপুর: শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মা নদীর বালুমহালে নিয়মবহির্ভূতভাবে ড্রেজিং করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। এতে বেড়িবাঁধ, চরের বসতঘর ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষ করে চরের কাছাকাছি এলাকার নদী থেকে গভীরভাবে বালু উত্তোলনের কারণে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ। নির্ধারিত সীমানা ও শর্ত না মেনে শতাধিক ড্রেজার ও কাটার মেশিন বসিয়ে দিনরাত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে সামনের বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তির লোক নদীতে একাধিক স্পিড বোট ও ট্রলারে অস্ত্র হাতে মহড়া দেওয়ায় ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারেন না তারা।

বিজ্ঞাপন

গত বছর নড়িয়ার চরাত্রা চরের বালুর স্তূপ থেকে ১০ কোটি ঘনফুট বালু নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে নড়িয়া উপজেলা প্রশাসন। প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য ০.৪৯ টাকা হিসাবে প্রায় চার কোটি ৯০ লাখ টাকায় কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাসিন তাহান কনস্ট্রাকশন। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ফরিদ উদ্দিন রয়েল মাঝি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। নিলামের শর্ত অনুযায়ী, শুধু স্তূপে থাকা বালু অপসারণের অনুমতি থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, স্তূপের বালুর পরিবর্তে পদ্মা নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে ড্রেজিং করে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্তূপের অন্তত ৩০০ মিটার আগে থেকেই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
সরেজমিনে নৌপথ ঘুরে দেখা যায়, চরাত্রায় বালুর স্তূপের নিচে ও এর পাশে আগে থেকেই ৯০-১০০টি কাটার ও ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ কর্মযজ্ঞ চলছে। এতে প্রশাসনের কতিপয় সদস্যদের যোগসাজশ রয়েছে বলে জানা গেছে।

এর আগে, গত বছরের ১৬ এপ্রিল নড়িয়ায় পদ্মা থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ, অবস্থান ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয়রা। নড়িয়ার ‘সর্বস্তরের জনসাধারণ’-এর ব্যানারে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। এরপর বালু উত্তোলন নিয়ে একই স্থানে বিএনপির দুই পক্ষ বিক্ষোভ ডাকায় ওই বছরের ২০ এপ্রিল ১৪৪ ধারা জারি করে নড়িয়া উপজেলা প্রশাসন। এ অবস্থায় বালু কাটার কাজ প্রায় সাত মাস বন্ধ ছিল। এভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা আকস্মিকভাবে বেড়ে গিয়ে তীব্র স্রোত সরাসরি নদীতীরে আঘাত হানছে। ফলে তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা, ফসলি জমি ও বসতভিটা ভাঙনের ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে। এই বালুর স্তূপের দেড়-দুই কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ‘নড়িয়া-জাজিরা পদ্মা নদীর ডান তীর রক্ষা প্রকল্প’-ও ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক যুগ ধরে পদ্মার ভয়াল ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে আসছে শরীয়তপুরের নড়িয়ার তীরবর্তী জনপদ। বিশেষ করে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভয়াবহ ভাঙনে নড়িয়ার প্রায় ৩০ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। নদীতে বিলীন হয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সরকারি-বেসরকারি নানা স্থাপনা, অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক।

নদীভাঙন থেকে নড়িয়া-জাজিরার মানুষকে রক্ষা করতে ২০১৯ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড ‘নড়িয়া-জাজিরা পদ্মা নদীর ডান তীর রক্ষা প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করে। প্রকল্পের আওতায় জাজিরার শফি কাজীর মোড় থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর পর্যন্ত প্রায় ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।

এ ছাড়া, প্রকল্পের অংশ হিসেবে সাড়ে ছয় কিলোমিটার নদীপথে চর খননের কাজও করা হয়। পাশাপাশি নির্মিত বাঁধ শক্তিশালী ও টেকসই করতে নড়িয়ার সুরেশ্বর থেকে মুলফৎগঞ্জ পর্যন্ত আরও ছয় কিলোমিটার এলাকায় নদীতে ফেলা হয় ১১ লাখ বালুভর্তি জিও ব্যাগ। এ কাজে ব্যয় হয়েছে আরও ৮০ কোটি টাকা।

সালাউদ্দিন মোল্লা নামের এক কৃষক বলেন, ‘আমরা এই জমিতে মরিচ ও ধানের চাষ করতাম। এখন তারা নিচ থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। বাধা দিলেও কোনো কথা শোনে না। আমাদের বিএনপির ভয় দেখিয়ে বলে যে প্রশাসন তাদের পক্ষে আছে, আমরা কিছুই করতে পারব না। তাই ভয়ে প্রতিবাদ করি না। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার হুমকিও দেয় রয়েল মাঝি।’

চরাত্রা এলাকার স্থানীয় সাবেক মেম্বার আব্দুল আউয়াল চোকদার বলেন, ‘নদীর ৩০ থেকে ৪০ ফুট গভীর থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এভাবে বালু কাটতে থাকলে আমরা এখানে টিকে থাকতে পারব না। ফসলি জমিতে ধান চাষ করা যাবে না, কৃষিকাজও হুমকির মুখে পড়বে। বালুর স্তূপ অপসারণের নামে তারা আসলে নদীর তলদেশ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এতে পুরো চরাত্রা ইউনিয়নই ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। আমরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত এই কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানাই।’

এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও উপজেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক ফরিদ উদ্দিন রয়েল মাঝি বলেন, ‘আমরা নিলামের মাধ্যমে কাজটি পেয়েছি এবং সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ পরিচালনা করছি। মাঝখানে সাত মাস কাজ বন্ধ ছিল। বর্তমানে নিয়ম মেনেই বালুর স্তূপ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।’

নদীতে দেশীয় অস্ত্রের মহড়া বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নদীতে ডাকাতি হয়, তাই পোলাপান এগুলো সঙ্গে রাখে।’

এ ছাড়া, কৃষকদের হুমকিধামকি দেওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

এ বিষয়ে শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুর রহমান কিরণের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মোবাইলফোনে একাধিকবার ফোন করার পর সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি ফোন রিসিভ করেও কেটে দেন।

ইউএনও আব্দুল কাইয়ুম খান বলেন, ‘বালু উত্তোলন কাজের তদারকির জন্য উপজেলার তিনটি দফতর নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। তারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে আমাদের রিপোর্ট দেবেন। নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব। কেউ লিখিত অভিযোগ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, ‘নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলন করা হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমি ইউএনওকে পাঠিয়ে বিষয়টি তদন্ত করাব।’