Monday 20 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ভবদহের জলাবদ্ধতা
‘শুকনোর সময় বাড়িতে হাঁটুজল, বর্ষায় গলাজল হয়’

ইমরান হোসেন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২০ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:১১

যশোরের ভবদহ নদীতে খাল পুনর্খনন চলছে। ছবি: সারাবাংলা

যশোর: ভবদহ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ যেন শেষই হচ্ছে না। শুষ্ক মৌসুমেও অবর্ণনীয় জলাবদ্ধতায় ভুগছেন যশোর ও খুলনার পাঁচ উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ। দীর্ঘদিনের এই সমস্যার সমাধানে এবার তিনটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসনে পানি উন্নয়ন বোর্ড আশাবাদী হলেও সুফল নিয়ে সংশয়ে ভুক্তভোগীরা।

উঠানে হাঁটুসমান পানি, শ্যাওলায় ভরা পরিবেশ। দেখলে মনে হবে পরিত্যক্ত বাড়ি। অথচ সাত মাসের বেশি সময় ধরে এই বাড়িতেই পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন রেখা হালদার। বাড়িতে ঢোকার একমাত্র ভরসা বাঁশের সাঁকো। ঘরের ভেতর পানি কমলেও উঠানে পানি, ডুবে থাকা টিউবওয়েল ও টয়লেটসব মিলিয়ে চরম দুর্ভোগে দিন কাটছে মনোহর নগরের এই পরিবারের।

বিজ্ঞাপন

রেখা হালদার আক্ষেপের সুরে সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এখন শুকনোর সময়। তাই আমাদের বাড়িতে হাঁটু জল। যখন বর্ষা মৌসুম শুরু হবে তখন তো উঠানে গলা জল হয়। ঘরের ভেতরেও জল থাকে। রান্না-খাওয়া, যাওয়া-আসা, গরু-ছাগল, ছোট বাচ্চা নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এরকমভাবে জীবন যাপন করা যায় না।’

এই চিত্র শুধু একটি বাড়ির নয়; যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ভবদহ অঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষের জীবন-যাপনের চিত্র প্রায় একই রকম। চার দশকের বেশি সময় ধরে স্থায়ী এই জলাবদ্ধতায় নাকাল পাঁচ উপজেলার মানুষ। এদিকে পলি জমে মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী নাব্যতা হারানোয় পানি নিষ্কাশনও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে এই অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবন-যাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।

ভবদহ নদীর জলাবদ্ধতার কারণে এখনো পানি জমে আছে বাড়ির উঠানে। ছবি: সারাবাংলা

ভবদহ নদীর জলাবদ্ধতার কারণে এখনো পানি জমে আছে বাড়ির উঠানে। ছবি: সারাবাংলা

জলাবদ্ধতার শিকার বাগডাঙ্গা গ্রামের তমা শিকদার সারাবাংলাকে বলেন, ‘গত বছর আষাঢ়ে জল আইছে। সেই থেকে এই জলের ভেতর বসবাস করছি। নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে দিন পার করছি। দীর্ঘদিন ফসল হচ্ছে না। খুব বিপদে আছি আমরা।’ মনেনাহর নগরের বিউটি বৈরাগী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের বাড়ির উঠানের মাটি যে শেষ কবে দেখেছি তা মনে পড়ে না। বছরের পর বছর এভাবে জল থাকে। আমরা এই জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি চাই। আমরা একটু শান্তিতে বসবাস করতে চাই।’

ভবদহ আন্দোলনের নেতা শিবপদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘বছরের পর বছর আমরা পানির নিচে তলিয়ে থাকি। দেখলাম জলাবদ্ধতা নিরসনে নদী কাটা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আমরা খুব আনন্দের সঙ্গে এটাকে গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু বাস্তাবতা হলো নদী কাটার সঙ্গে সঙ্গে যদি টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) না হয় এবং ধারাবাহিকভাবে পাঁচ বছর অন্তর বিলে বিলে টিআরএম না করা হয় তাহলে এই নদী কাটা বৃথা হবে। এর থেকে কোনো সুফল পাব না আমরা।’

আন্দোলনের আরেক নেতা অনিল বিশ্বাস সারাবাংলাকে জানান, জনগণ যা চায় পানি উন্নয়ন বোর্ড তার উল্টোটা করে। পানি উন্নয়ন বোর্ড হচ্ছে দুর্নীতির আখড়া। দেশের দুর্নীতি করার জায়গা হচ্ছে নদী খনন, নদী সেচ, নদীর পাড় বাঁধা। পানি উন্নয়ন বোর্ড এখনো এখানে সেচ প্রকল্প চাচ্ছে, যা প্রাকৃতিক সমাধান না। এখানে বিদ্যুৎ নেই, টেকনিশিয়ান নেই। খনন করে আবার যদি সেচ কাজ করে তাহলে নদীগুলো মারা যাবে। নদী দখল মুক্ত করে সঠিকভাবে খননের পাশিপাশি টিআরএম চালু করলেই কেবলমাত্র জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান আসবে।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ সারাাবংলাকে বলেন, ‘ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি ও ভবদহ জনপদের মানুষের র্দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে বিগত সরকারে আমলে আমডাঙ্গা খাল সংস্কার, নদী ও খাল খনন এবং টিআরএম প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। আমরা আশাবদী হয়েছিলাম, আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একবছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি।’

ভবদহ নদীর জলাবদ্ধতার কারণে এভাবেই কয়েক বছর ধরে পানি জমে আছে। ছবি: সারাবাংলা

ভবদহ নদীর জলাবদ্ধতার কারণে এভাবেই কয়েক বছর ধরে পানি জমে আছে। ছবি: সারাবাংলা

তিনি আরও বলেন, ‘নদী খননের কাজের বিস্তারিত জনসম্মুখে টাঙানোর কথা ছিল। কিন্তু সেটিও করেনি। ফলে নদী কাটা কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। আমরা পরিষ্কারভাবে বলেছিলাম, নদী খননের সঙ্গে সঙ্গে যদি কোনো একটা বিলে টিআরএম চালু না করা হয় তাহলে দ্রুতই নদী আবার ভরাট হয়ে যাবে।’ এরই মধ্যে সেখানে যে টাকা খরচ হয়েছে, মানুষের ভেতর আশার সঞ্চার হয়েছে, তার ধারাবাহিকতা রাখতে নতুন সরকারের কাছে দ্রুতই টিআরএম বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি সারাবাংলাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের এই সমস্যার সমাধানে পানি উন্নয়ন বোর্ড ২৬৮ কোটি টাকার দু’টি প্রকল্পে নদী ও খাল পুনর্খননের কাজ শুরু করেছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনর্খনন চলছে। পাশাপাশি ৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৪টি খাল পুনর্খনন এবং সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৪৯ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২ দশমিক ৭০ কিলোমিটার আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খননের পরে পলি ব্যবস্থাপনার জন্য আরও ২৮০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন হবে।’

উল্লেখ্য, চার দশকের এই জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত সময়ে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হলেও কার্যকর সমাধান মেলেনি। অভয়নগরের ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইসগেট থেকে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কাশিমপুর পর্যন্ত হরি নদীর ১৫ কিলোমিটার, কাশিমপুর থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত তেলিগাতী নদী পাঁচ কিলোমিটার, মনিরামপুরের বাকশপোল থেকে কেশবপুর বরেঙ্গা পর্যন্ত হরিহর নদ ৩৫ কিলোমিটার, বরেঙ্গা থেকে কাশিমপুর পর্যন্ত আপার ভদ্রা নদী ১৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার, অভয়নগর গোঘাটা থেকে ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইসগেট পর্যন্ত টেকা নদী সাত কিলোমিটার এবং মনিরামপুর নেহালপুর বাজার এলাকায় এক কিলোমিটার শ্রী নদী পুনর্খনন করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর