টাঙ্গাইল: স্ট্রবেরি মূলত শীতপ্রধান দেশের ফল। কিন্তু এই ফলটি বর্তমানে বাংলাদেশেও চাষ হচ্ছে। মূলত দেশের যেসব এলাকায় শীত বেশি পড়ে ও বেশি দিন স্থায়ী হয়, সেসব এলাকায় উচ্চফলনশীল বারি স্ট্রবেরি চাষ হচ্ছে। জমির পাশাপাশি টব, বাড়ির ছাদ বা বারান্দায় এই ফল চাষ হয়ে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় আমেরিকান ফেসটিভ্যাল জাতের স্ট্রবেরি চাষ করে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার শোলাকুড়া গ্রামের অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন (২২)।
চলতি মৌসুমে খরচ বাদে ১০ লাখ টাকার লাভের প্রত্যাশা করছেন তিনি। মামুনের এ সফলতা দেখে এলাকায় অনেক যুবক স্ট্রবেরি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। অন্যদিকে বাজারে স্ট্রবেরি ফলের চাহিদা, ফলন ও দাম ভালো পাওয়ায় প্রতিনিয়ত কৃষকের মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে এর চাষ। বাণিজ্যিকভাবে স্ট্রবেরির বাগান করতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন অনেকে।
সরজমিনে মামুনের স্ট্রবেরি বাগানে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তৃত এলাকা জুড়ে টসটসে রসালো স্ট্রবেরি বাগানের দৃশ্য। সারিবদ্ধ লাইনে স্ট্রবেরি গাছ। প্রতিটি গাছে শোভা পাচ্ছে লাল পাকা স্ট্রবেরি। মামুনের পরিবারের লোকজন স্ট্রবেরি বিবণনের জন্য প্যাকেজিংয়ের কাজ করছেন। ওই এলাকায় নতুন এই ফলের আবাদ দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন স্থানীয়রা।
তরুণ উদ্যোক্তা মামুন সারাবাংলাকে জানান, তার নিজ চেষ্টায় বাড়ির পাশে ২০২২ সালে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমে ১০০টি চারা দিয়ে শুরু করেন স্ট্রবেরির বাগান। ভালো ফলন পাওয়ায় পরের বছর শুরু করেন বাণিজ্যিক চাষ। বর্তমানে তিনি দুই বিঘা জমিতে ১০ হাজার স্ট্রবেরির চারা লাগিয়েছেন। প্রতিটি গাছ থেকে প্রায় আধা কেজি ফল পাওয়া যাচ্ছে। আর বর্তমানে প্রতিকেজি স্ট্রবেরি পাইকারি ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ বছর ফল ও চারা বিক্রি করে ১০ লাখ টাকার লাভের আশা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত স্ট্রবেরির চারা রোপণ করা যায়। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে গাছে ফুল আসতে শুরু করে। জানুয়ারির মধ্য ভাগ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ফল আহরণ ও বিক্রি করা যায়। কৃষি অফিসের সহযোগিতা পেলে চাষাবাদের আরও বিস্তার ঘটিয়ে বিদেশেও এই ফল রফতানি করা সম্ভব। সেই লক্ষ্য আগামীতে আরও বড় পরিসরে বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
মামুন আরও বলেন, ‘শুরুর দিকে পরিবারের সদস্যরা স্ট্রবেরি চাষের প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে আগ্রহ দেখাননি। কিন্তু এখন সবাই উৎসাহ দিচ্ছেন। প্রতিটি গাছে লাল টকটকে ফল দেখতে বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন। পাশাপাশি স্থানীয় যুবক ও বিভিন্ন এলাকার মানুষ বাগান করার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।’
বাগান পরিদর্শনে আসা কলেজ ছাত্রী সুমি আক্তার সারাবাংলাকে জানান, ‘বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে জানতে পেরে আমি স্ট্রবেরি বাগান দেখতে এসেছি। এখান থেকে চারা সংগ্রহ করে নিজের ছাদে রোপণ করব। স্ট্রবেরি বাজারে দামি হওয়ায় উৎপাদন করে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে আত্মীয় স্বজনদের দিতে চাই।’
স্থানীয় যুবক রুবেল মিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘মামুন ভাইয়ের স্ট্রবেরির বাগান দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। এ বছর স্ট্রবেরির ফলন ভালো হয়েছে। ফলটি দেখতে টকটকে লাল, খেতেও সুস্বাদু এবং দারুণ উপকারী। ভবিষ্যতে আমিও একটি বাগান করার চিন্তা করছি। সেই লক্ষ্যে এই বাগান পরিদর্শনে এসেছি।’
ঘাটাইল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দিলশাদ জাহান সারাবাংলাকে জানান, ‘স্ট্রবেরি উচ্চ পুষ্টি সমৃদ্ধ একটি বিদেশি ফল। স্বাদে অতুলনীয় হওয়ায় এটি সারাবিশ্বে সমাদৃত। সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাসে চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে গাছে ফুল আসতে শুরু করে এবং মাসের শেষ ভাগ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘মামুন নামের একজন তরুণ কৃষক ঘাটাইলে স্ট্রবেরি চাষ করে সফল হয়েছেন। স্ট্রবেরি চাষ করে তিনি এলাকায় আলোচনা সৃষ্টি করেছেন। তিনি চাইলে কৃষিবিভাগ থেকে তাকে সহযোগিতা করা হবে। এ ছাড়া, ঘাটাইলে কোনো কৃষক স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক চাষাবাদে আগ্রহী হলে কৃষি বিভাগ তাদেরও সার্বিক সহযোগিতা দেবে।’
উল্লেখ্য, গন্ধ, বর্ণ ও স্বাদে আকর্ষণীয় এই ফলের রস, জ্যাম, আইসক্রিম, মিল্কশেকসহ শিল্পজাত খাদ্য তৈরিতে লাগে। এ ছাড়া, স্ট্রবেরির সুগন্ধ ব্যাপকভাবে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহৃত হয়। ফলে এই ফলের চাহিদা দেশেও ব্যাপকভাবে বাড়ছে।