কক্সবাজার: কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় ফের স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় মো. ইউনুছ (২৫) নামে এক রোহিঙ্গা যুবক গুরুতর আহত হয়েছেন।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পালংখালী সীমান্তের বিপরীতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চাকমাকাটা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
আহত ইউনুছ উখিয়ার ক্যাম্প-১৯-এর ব্লক ডি/২ এর বাসিন্দা। স্থানীয় বাসিন্দারা নিশ্চিত করেন, বিস্ফোরণের শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। পরে তাকে প্রথমে কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা শান্তনু ঘোষ জানিয়েছে, ইউনুছের ডান পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এর পাঁচদিন আগে গত শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে একই সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় আরেকটি স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে মো. সাদেক (২৫) নামে এক রোহিঙ্গা যুবক গুরুতর আহত হন। তিনি উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১০) এফ-১৩ ব্লকের বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সেদিন ভোরে জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরতে গিয়ে ফেরার পথে অসাবধানতাবশত মাইনের ওপর পা দিলে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে সাদেকের বাঁ পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ডান পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় গত পাঁচ দিনের ব্যবধানে দুটি পৃথক ঘটনায় দুই রোহিঙ্গা যুবক পা হারিয়েছেন। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদ মো. জাফর দাবি করেন, জীবিকার তাগিদে অনেকেই সীমান্ত অতিক্রম করে সীমান্ত এলাকায় মাছ ধরা কিংবা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে যান। তবে সাম্প্রতিক এসব বিস্ফোরণের ঘটনায় তাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তার ভাষ্য, “সীমান্ত এলাকায় এখন খুব ভয় লাগে। জীবিকার জন্য গেলে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি থাকে।”
বালুখালী আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা শামসুল আলম দাবি করেন, খাদ্যসহায়তা কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার অর্থসংকটে পড়েছে। ফলে কিছু রোহিঙ্গা ঝুঁকি জেনেও নাফ নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে এবং সীমান্তে ওপারে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে যান। এ সময় তারা মাইন বিস্ফোরণের শিকার হচ্ছেন।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) উখিয়া ৬৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম মন্তব্য করেন, সীমান্তের শূন্যরেখার ওপারে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে এসব স্থলমাইন পুঁতে রাখা হয়েছে। যা ওই এলাকায় চলাচলকারী মানুষের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নাফ নদীর পূর্ব পাশে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। নদীর শাখা জাইল্যাখালীর শেষ প্রান্তসহ শূন্যরেখার বিভিন্ন চর বিশেষ করে ‘নারিকেল বাগান’ এলাকায় মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, রাখাইনের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ) নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করতে এসব মাইন স্থাপন করেছে।
এর আগেও চলতি বছরের ২৯ মার্চ উখিয়া সীমান্তে নাফ নদীর শূন্যরেখায় মাইন বিস্ফোরণে আবদুল হাকিম (১৫) নামে এক রোহিঙ্গা কিশোরের ডান পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়। একইভাবে এর কয়েক দিন আগে পালংখালী ইউনিয়নের আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তে আরেক বিস্ফোরণে শহীদুল ইসলাম (২৫) নামে এক যুবক গুরুতর আহত হন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রাণহানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।