কক্সবাজার: কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে বর্ষার টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালে গড়ে ওঠা বসতিতে বসবাসকারী লাখের বেশি রোহিঙ্গা এখন ঝুঁকিতে রয়েছেন। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজনে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।
বিশ্বের বৃহত্তম রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির কুতুপালং মেগাক্যাম্পসহ উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধ্যে অন্তত আটটি ক্যাম্প পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্ষার টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের ঢাল নরম হয়ে মাটি ধসে পড়ছে। ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন স্থানে বালুভর্তি বস্তা ও ত্রিপল ব্যবহার করা হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। ফলে প্রতিটি ভারী বৃষ্টির সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
কুতুপালং মেগাক্যাম্পের ৪ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. রফিক বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই ভয় লাগে। কারণ পাহাড় ধসে পড়ে। তাই রাতে জেগে থাকি।’
একই ক্যাম্পের বাসিন্দা সলিম উল্লাহ বলেন, ‘ভারী বৃষ্টি হলেই পাহাড় ধসে পড়ে। এটা প্রতিবছরই হয়। পাহাড়ের ওপর থাকি, ছেলে-মেয়েদের নিয়ে সবসময় ভয়ে থাকি।’
ক্যাম্প-৯-এর বাসিন্দা মরিয়ম খাতুন বলেন, ‘পাহাড়ের ওপর ঘর নির্মাণ করেছি। এখন পাহাড়ের ওপরেও ঘর, নিচেও ঘর। কোন সময় পাহাড় ধসে পড়বে সেই ভয়ে থাকি।’
ক্যাম্প-১০-এর সি ব্লকের বাসিন্দা দিলদার বেগম বলেন, ‘ক্যাম্পের জীবন বেশি কষ্টের। কারণ পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বসবাস করতে হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে প্রতিবছরই পাহাড় ধসে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এবং ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
একই ক্যাম্পের বাসিন্দা সৈয়দ আলম বলেন, ‘ক্যাম্পে তো জায়গা কম, খুবই ঘনবসতি। এখন পাহাড়ে না থেকে যাব কোথায়?’
এদিকে, ঘনবসতি ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতির কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ভূমিধস ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটি দুর্যোগ প্রস্তুতি ও ঝুঁকি কমানোর কার্যক্রম জোরদারে দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন বলেন, ‘ক্যাম্পগুলো খুবই ঘনবসতিপূর্ণ, আর জনসংখ্যাও বাড়ছে। আমরা দেখছি অনেক মানুষ এমন জায়গায় বসবাস করছেন, যেখানে আসলে তাদের থাকা উচিত নয়। কেউ পাহাড়ের ঢালে থাকছেন, যেখানে ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে। আবার কেউ এমন এলাকায় থাকছেন, যা আজকের মতো ভারী বৃষ্টিতে প্লাবিত হয়ে যায়। এটি একটি বড় সমস্যা। এর কিছু সমাধান ক্যাম্পের অবকাঠামো ও পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত। তবে আমরা দুর্যোগের জন্য প্রস্তুতি, আগাম সতর্কবার্তা এবং ঝুঁকি কমানোর বিভিন্ন কাজও করছি। আমরা দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই, যেন তারা এসব উদ্যোগে সহায়তা অব্যাহত রাখে। শুধু জরুরি সাড়ার জন্য নয়, ঝুঁকি কমানো এবং দুর্যোগ প্রতিরোধেও বিনিয়োগ করা জরুরি। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগে থেকে প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে ক্ষতি ও খরচ দু’টোই কমানো সম্ভব।’
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান জানান, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই প্রতিটি ক্যাম্পে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে। গত বছর এ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, এবারও তা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।