ঢাকা: চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
তিনি বলেছেন, “এবারের বেইজিং সফরে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ‘কমিউনিটি অব শেয়ার্ড ফিউচার’ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, যা বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।”
শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা জানতে চান, গত বছরের চীন সফরের তুলনায় এবারের সফরের বিশেষত্ব কী এবং এতে বাংলাদেশের অর্থনীতি কতটা লাভবান হতে পারে।
জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের চীন সফরের সময় হাতে ছিল মাত্র ১১ মাস। কিন্তু বর্তমান সরকারের সামনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ। ফলে এবারের সফরে ভবিষ্যৎভিত্তিক সহযোগিতার ভিত্তি আরও শক্ত হয়েছে।’
তিনি জানান, আগে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’। এখন তা উন্নীত হয়ে ‘কমিউনিটি অব শেয়ার্ড ফিউচার’-এ পৌঁছেছে, যা চীনের সঙ্গে খুব অল্প কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
খলিলুর রহমান বলেন, ‘দুই দেশের নিয়মিত নীতিগত সংলাপও এখন পররাষ্ট্র সচিব পর্যায় থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাস্তবায়ন দ্রুত এগোচ্ছে এবং আগামী ১৮ মাসের মধ্যে সেখানে প্রথম কারখানা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সম্ভাব্য বহুমুখী যোগাযোগ (মাল্টিমোডাল কানেক্টিভিটি) নিয়ে এখন কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) হবে। এর উদ্দেশ্য হলো পরিবহন ব্যয় ও সময় কমিয়ে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো এবং আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে ট্রান্সপোর্ট করিডোরের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্রুত ও কম খরচে যোগাযোগ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চায়।’
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক জানতে চান, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হওয়ার ফলে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন কোনো অগ্রগতি হয়েছে কি না।
জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, ‘চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—উভয় পক্ষকে সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছে, যাতে দ্রুত এই সংকটের সমাধান সম্ভব হয়।’
তিনি জানান, এ বিষয়ে মিয়ানমার সরকার, রাখাইন অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের—এই তিন পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি বর্তমান সরকার যে জনসমর্থন ও রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে কাজ করছে, তাতে আগামী দিনে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের একটি পথ আমরা দেখতে পাব।’
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সময়সীমা সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো বছর উল্লেখ না করলেও তিনি বলেন, ‘অতীতে বিএনপি সরকারের আমলে দুই দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। এবারও সরকার সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে টেকসই সমাধানের চেষ্টা করবে।’
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা চীন সফরের গণমাধ্যম প্রচার, যৌথ বিবৃতির তাৎপর্য এবং অতীত সফরের সঙ্গে তুলনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এবারের সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আস্থা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্বের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর একসঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। এত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণই প্রমাণ করে, বাংলাদেশকে চীন কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রে চীন সবসময় পাশে থাকবে—এমন বার্তাই এবারের সফরে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।’
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, বিডা চেয়ারম্যান আশিক বিন হারুন চৌধুরী ও পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম উপস্থিত ছিলেন।