আমাদের যাপিত জীবনে সব সময় ফ্যাশনের ট্রেন্ড চক্রাকারে আবর্তিত হয়। পুরোনো জিনিসই কালের নিয়মে নতুন মোড়কে ঘুরে-ফিরে আসে। ঠিক যেমনটা ঘটল নব্বইয়ের দশকের (90s Fashion) সেই জনপ্রিয় ‘হেডগিয়ার’ বা মাথায় স্কার্ফ বাঁধার স্টাইল অর্থাৎ ‘ব্যানড্যানা’ (Bandana)-র ক্ষেত্রে। এক সময়ের সুপারহিট এই ট্রেন্ডটি কয়েক দশক পর আরও একবার রাজকীয় প্রত্যাবর্তন করেছে আধুনিক ফ্যাশন দুনিয়ায়।
পুরোনো ফ্যাশনের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ও তরুণ প্রজন্ম
নব্বইয়ের দশকের পপ কালচার, হিপ-হপ মিউজিক ভিডিও এবং রেট্রো সিনেমার হাত ধরে ব্যানড্যানা বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সে সময় কপালের ওপর চওড়া করে কাপড় বেঁধে রাখা বা চুলের ওপর জলদস্যু স্টাইলে স্কার্ফ জড়িয়ে রাখার মধ্যে যে একটা ‘বিদ্রোহী’ এবং ‘কুল’ ভাব ছিল, তা আজ আবারও ফ্যাশন রানওয়ে থেকে শুরু করে সাধারণের স্ট্রিট স্টাইলে জায়গা করে নিয়েছে।
ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের জেনারেশন জেড (Gen-Z) ও মিলিনিয়ালদের কাছে ‘ভিন্টেজ’ বা পুরোনো ধারার প্রতি এক ধরনের অন্যরকম আকর্ষণ কাজ করে। নব্বইয়ের দশকের ফ্যাশনকে তারা কেবল অনুকরণ করছে না, বরং নিজেদের মতো করে অ্যাডাপ্ট বা রূপান্তর করে নিচ্ছে। কলেজ ক্যাম্পাস, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, কনসার্ট কিংবা উইকএন্ড ট্রিপ—সবখানেই আজকের তরুণ প্রজন্ম অত্যন্ত দারুণভাবে এই ভিন্টেজ হেডগিয়ারকে তাদের প্রাত্যহিক ফ্যাশনের অংশ বানিয়ে নিয়েছে। এটি একদিকে যেমন পুরোনো নস্টালজিয়াকে মনে করিয়ে দেয়, অন্যদিকে তরুণদের লুকে যোগ করে এক লহমায় বোল্ড ও কেতাদুরস্ত ভাইব।
সেলিব্রিটিদের মাঝেও জনপ্রিয় ‘ব্যানড্যানা’
বলিউড ডিভারাও এখন মেতেছেন এই পুরোনো ট্রেন্ডের নতুন ম্যাজিকে:
প্রিয়াঙ্কা চোপড়া: লন্ডনে উইম্বলডন টেনিস টুর্নামেন্টের গ্যালারিতে একটি ক্লাসিক কো-অর্ড সেটের সঙ্গে মাথায় ম্যাচিং ব্যানড্যানা বেঁধে হাজির হয়েছিলেন তিনি, যা অত্যন্ত এলিগ্যান্ট ও স্পোর্টি ভাইব তৈরি করেছে।
করিনা কাপুর খান: মালদ্বীপের সৈকতে সমুদ্রের হাওয়া থেকে চুল রক্ষা করতে এবং স্টাইলিশ বিচ লুক ধরে রাখতে করিনা বেছে নিয়েছিলেন প্রিন্টেড ব্যানড্যানা।
আলিয়া ভাট: সাধারণ টি-শার্ট ও জিন্সের সঙ্গে মাথায় রঙিন ব্যানড্যানা চুলে ব্যান্ড বা হেয়ার ব্যান্ডের মতো করে বেঁধে প্রায়শই ক্যাজুয়াল লুকে ধরা দিচ্ছেন আলিয়া।

কেন তরুণ প্রজন্মের প্রথম পছন্দ ব্যানড্যানা?
মাল্টিটাস্কার বা সুরক্ষাকবচ: এটি কেবল ফ্যাশন অনুষঙ্গ নয়, বরং তীব্র রোদ, ধুলোবালি এবং অতিবেগুনি রশ্মির হাত থেকে চুল ও স্ক্যাল্পকে রক্ষা করার দারুণ এক উপায়।
গ্রীষ্ম ও বর্ষার পারফেক্ট সঙ্গী: এই স্যাঁতসেঁতে বা গরম আবহাওয়ায় আর্দ্রতা ও ঘামের কারণে অনেকেরই চুল চিটচিটে হয়ে যায় বা হেয়ারস্টাইল নষ্ট হয়। ব্যানড্যানা খুব সহজে এই ‘ব্যাড হেয়ার ডে’-র সমস্যা ঢেকে দেয়।
ইনস্ট্যান্ট মেকওভার: খুব সাধারণ বা একঘেয়ে পোশাকের সঙ্গে কেবল একটি উজ্জ্বল রঙের বা ফ্লোরাল প্রিন্টের ব্যানড্যানা ব্যবহার করলেই পুরো লুক নিমেষে ‘কুল’ ও ট্রেন্ডি হয়ে ওঠে।
কোন পোশাকের সাথে কেমন ব্যানড্যানা? (স্টাইল টিপস)
আপনি যদি এই রেট্রো ট্রেন্ডে নিজেকে সাজাতে চান, তবে পোশাকের সাথে মিলিয়ে বেছে নিতে পারেন সঠিক ব্যানড্যানা…
ক্যাজুয়াল টি-শার্ট ও জিন্স: সাধারণ সুতির টি-শার্ট বা ক্রপ টপের সাথে ক্লাসিক লাল, কালো বা নীল রঙের ‘পেইসলে প্রিন্ট’ (Paisley Print)-এর সুতির ব্যানড্যানা হেয়ারব্যান্ডের মতো করে মাথায় বাঁধুন। এটি আপনাকে একদম পারফেক্ট ‘স্ট্রিট স্টাইল’ লুক দেবে।
সামার ড্রেস বা ফ্লোরাল ওয়ানপিস: হালকা ও ওয়ানপিস ড্রেসের সাথে ফ্লোরাল প্রিন্টের বা প্যাস্টেল শেডের (যেমন- হালকা গোলাপি, পুদিনা সবুজ বা লেমন ইয়োলো) রেশমি (Silk) ব্যানড্যানা দারুণ মানায়। চুল পনিটেল করে তার ওপর স্কার্ফটি পেঁচিয়ে বাঁধতে পারেন।
ওভারসাইজড শার্ট ও বিচ ওয়্যার: ছুটির মেজাজে বা সমুদ্র সৈকতে শর্টস ও ওভারসাইজড শার্টের সাথে চুলে একটু চওড়া করে ‘জলদস্যু’ বা পাইরেট স্টাইলে ট্রাইবাল কিংবা জ্যামিতিক প্রিন্টের উজ্জ্বল ব্যানড্যানা মাথায় বেঁধে নিতে পারেন।
ফর্মাল বা সেমি-ফর্মাল কো-অর্ড সেট: ব্লেজার বা একরঙা কো-অর্ড সেটের সাথে একটু গর্জিয়াস সিল্কের মনোকোম (Monochrome) বা সাটিন কাপড়ের ব্যানড্যানা ব্যবহার করুন। এতে লুকে একটা ক্লাসি ও কর্পোরেট ভাইব আসবে।
আজকাল বাজারে কী কী ধরণের ব্যানড্যানা পাওয়া যাচ্ছে?
নব্বইয়ের দশকের এই ট্রেন্ডটি ফিরে আসার পর এখন বাজারে ফ্যাশনপ্রেমীদের পছন্দ এবং আরামের কথা মাথায় রেখে হরেক রকমের ব্যানড্যানা মিলছে। ফেব্রিক, প্রিন্ট এবং স্টাইলের ওপর ভিত্তি করে প্রধান যে ধরণের ব্যানড্যানাগুলো এখন সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়, তা নিচে দেওয়া হলো…
ক্লাসিক সুতি বা কটন ব্যানড্যানা: গরম ও বর্ষার দিনে ক্যাজুয়াল স্টাইলের জন্য সুতির ব্যানড্যানার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এগুলো সাধারণত চারকোনা সুতির কাপড় হয়, যা কপালে বা চুলে ব্যান্ডানার মতো পেঁচিয়ে বাঁধা সহজ। ঘাম শুষে নেওয়ার জন্য এটি বেশ আরামদায়ক।
সিল্ক ও সাটিন ব্যানড্যানা: একটু গর্জিয়াস বা সেমি-ফর্মাল লুকের জন্য সিল্ক বা সাটিন কাপড়ের ব্যানড্যানা এখন দারুণ ট্রেন্ডি। এগুলো দেখতে বেশ চকচকে ও প্রিমিয়াম লাগে। চুলে কোনো ধরণের ঘর্ষণ না লাগায় চুলের সুরক্ষাতেও অনেকে সিল্কের ব্যানড্যানা বেছে নিচ্ছেন।
পেইসলে প্রিন্ট (Paisley Print) ব্যানড্যানা: নব্বইয়ের দশকের সেই চেনা ঐতিহ্যবাহী কলকা বা জ্যামিতিক নকশার প্রিন্টকেই বলা হয় পেইসলে প্রিন্ট। লাল, কালো, সাদা, নেভি ব্লু রঙের ওপর এই প্রিন্টের ব্যানড্যানাগুলো এভারগ্রিন এবং স্ট্রিট ফ্যাশনে জেনারেশন জেড-এর প্রথম পছন্দ।
ফ্লোরাল ও বোহো প্রিন্ট: তরুণীদের মধ্যে ফুল-পাতা বা ফ্লোরাল মোটিফের এবং টাই-ডাই বা বোহেমিয়ান স্টাইলের ব্যানড্যানার বেশ চল দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে সামার ড্রেস, ওয়ানপিস বা বিচ ওয়্যারের সাথে এই রঙিন ব্যানড্যানাগুলো দারুণ মানিয়ে যায়।
রেডিমেড বা ইলাস্টিক ব্যানড্যানা: যারা স্কার্ফ বা কাপড় ধরে মাথায় নিখুঁতভাবে গিঁট দিতে পারেন না বা ঝামেলা এড়াতে চান, তাদের জন্য বাজারে এসেছে ইলাস্টিকযুক্ত রেডিমেড ব্যানড্যানা। এগুলো হেয়ারব্যান্ডের মতোই চটজলদি মাথায় পরে নেওয়া যায়।
কুশিকাঁটার (Crochet) ব্যানড্যানা: বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেশি জনপ্রিয় ত্রিভুজ আকৃতির এই ব্যানড্যানাগুলো। এটি মূলত উল বা সুতি সুতো দিয়ে তৈরি হয়। এর মধ্যে থাকা বোহেমিয়ান ও ভিন্টেজ ভাইব কলেজপড়ুয়া বা ট্রেন্ডি তরুণ-তরুণীদের ক্যাজুয়াল ফ্যাশনে এক অন্যরকম মাত্রা যোগ করেছে। ফ্লোরাল মোটিফ বা হরেক রঙের সুতোর বুননে তৈরি এই কুশিকাঁটার ব্যানড্যানাগুলো যেকোনো সাধারণ কুর্তি, টপস বা ডেনিম জ্যাকেটের সাথে অনায়াসে একটি ইউনিক ‘আর্টি’ লুক এনে দেয়।
তাই এই মরশুমে নিজের ফ্যাশন স্টেটমেন্টে একটু নব্বইয়ের দশকের ছোঁয়া আনতে এবং চটজলদি ট্রেন্ডি লুক পেতে আপনার কালেকশনেও আজই যোগ করতে পারেন দু-একটা রেশমি বা সুতির ব্যানড্যানা স্কার্ফ!