পেট্রোল-ডিজেলের এই অগ্নিমূল্যের বাজারে পকেটের পয়সা বাঁচাতে আমরা কত কিছুই না করি! গাড়ি বা বাইকচালকদের মধ্যে একটা বহুল প্রচলিত ধারণা আছে যে, ভোরবেলা বা রাতে জ্বালানি তেল নিলে নাকি বেশি লাভ হয়। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, সকালের ঠান্ডা আবহাওয়ায় তেল ঘন থাকে, তাই একই দামে পরিমাণে বেশি তেল পাওয়া যায়। আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিটি বিজ্ঞানসম্মত মনে হলেও, বাস্তবে এটি কি আসলেই খাঁটি সত্য, নাকি কেবলই একটি আধুনিক গুজব?
আসুন জেনে নেই, বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে এর আসল রহস্য…
কেন সকালে তেল নেওয়ার ধারণাটি ভুল?
পেট্রোল পাম্পের তেল কিন্তু বাইরে খোলা অবস্থায় থাকে না, বরং তা মাটির নিচে থাকা বড় বড় সুড়ঙ্গ আকৃতির ভূগর্ভস্থ ট্যাংকে সংরক্ষিত থাকে। মাটির গভীর স্তরে থাকার কারণে বাইরের তীব্র রোদ বা ঠান্ডা আবহাওয়ার প্রভাব এই ট্যাংকের ওপর সরাসরি পড়ে না।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, চব্বিশ ঘণ্টায় মাটির নিচের এই জ্বালানির তাপমাত্রার পার্থক্য মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও কম হয়ে থাকে। এর অর্থ হলো, আপনি সকাল ৬টার ঠান্ডায় তেল নিন কিংবা দুপুর ২টার কড়া রোদে, পাম্পের নজেল দিয়ে আপনার গাড়ির ট্যাংকে যে তেল ঢুকছে, তার ঘনত্ব ও পরিমাণে বিন্দুমাত্র কোনো তফাত ঘটে না। উল্টো সকাল সকাল তেল নেওয়ার জন্য বাড়তি গাড়ি চালিয়ে পাম্পে গেলে যে তেল খরচ হবে, তাতেই আপনার লস!
তাহলে জ্বালানি ও টাকা বাঁচানোর আসল উপায় কী?
দিনের যেকোনো নির্দিষ্ট সময়ে তেল ভরার চেয়ে আপনার ড্রাইভিং অভ্যাস এবং গাড়ির সঠিক যত্নই পারে তেল খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে। এজন্য নিচের পরামর্শগুলো মেনে চলতে পারেন…
ট্যাংক একদম খালি করবেন না: ফুয়েল ইন্ডিকেটর বা তেলের কাঁটা যখন চারভাগের একভাগে (Quarter Tank) নেমে আসবে, তখনই তেল ভরে নিন। ট্যাংক পুরো খালি করে গাড়ি চালালে মোটরের ওপর চাপ পড়ে এবং ট্যাংকের নিচের জমে থাকা ময়লা ফুয়েল ফিল্টার নষ্ট করে দিতে পারে।
টায়ারের হাওয়ার চাপ ঠিক রাখুন: টায়ারে হাওয়া কম থাকলে রাস্তা ও চাকার ঘর্ষণ বেড়ে যায়, ফলে ইঞ্জিনকে বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে হয় এবং তেল বেশি পোড়ে। তাই প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার টায়ারের প্রেশার চেক করুন।
স্মুথ ড্রাইভিং অভ্যাস গড়ে তুলুন: হুটহাট ব্রেক করা কিংবা হুট করে জ্যামের মধ্যে জোরে এক্সিলারেটর চাপার অভ্যাস পরিহার করুন। গাড়ি সবসময় একটি নির্দিষ্ট গতিতে (ইকোনমি স্পিড) চালালে সবচেয়ে সেরা মাইলেজ পাওয়া যায়।
দাম বাড়ার খবরে সচেতন থাকুন: যেসব দেশে বা শহরে জ্বালানির দাম প্রতিদিন ওঠানামা করে, সেখানে দাম বাড়ার আভাস পাওয়া মাত্রই ট্যাংক ফুল করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
সহজ কথায়, ঘড়ির কাঁটা মেপে কাকডাকা ভোরে পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে আপনার এক পয়সাও সাশ্রয় হবে না। কারণ লাভ-ক্ষতির হিসাবটা সময়ের ওপর নয়, নির্ভর করে আপনার রাইডিং স্টাইলের ওপর। কোনো অন্ধবিশ্বাস বা গুজবে কান না দিয়ে নিজের বাহনটির সঠিক যত্ন নিন এবং শান্ত মাথায় গাড়ি চালান; দিনশেষে এটিই আপনার পকেটের টাকা বাঁচানোর একমাত্র আসল চাবিকাঠি।