Wednesday 10 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

প্রথমবার ডাইনি সন্দেহে ফাঁসি দেয়া হয় এক নারীকে!

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১০ জুন ২০২৬ ১৬:১৭

বিচারের এজলাসে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন ষাটোর্ধ্ব এক নারী, যার একমাত্র অপরাধ তিনি তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজের মতো বাঁচতে চেয়েছিলেন। হঠাৎ করেই আদালতের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে ছটফট করতে শুরু করল কয়েকটি ছোট মেয়ে। তারা চিৎকার করে বলতে লাগল, ওই নারীর অদৃশ্য আত্মা নাকি এসে তাদের গলা টিপে ধরছে! আধুনিক বিজ্ঞান বা আইনি ব্যবস্থার চোখে এটি স্রেফ অভিনয় কিংবা মানসিক ব্যাধি মনে হলেও, আজ থেকে ৩৩৪ বছর আগের আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের সালেম শহরে এটিই ছিল মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ‘প্রমাণ’। অলৌকিক ভয়, প্রতিবেশীদের তীব্র হিংসা আর এক অদ্ভুত গণ-হিস্টিরিয়া কীভাবে একটি সাজানো সমাজকে নরক বানিয়ে তুলতে পারে, ব্রিজেট বিশপ নামের সেই নারীর জীবন ও মৃত্যু তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কোনো কাল্পনিক গল্প বা অতিরঞ্জন ছাড়াই, সমকালীন আদালতের নথিপত্র এবং ঐতিহাসিক সত্যের ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে এই বিশেষ ফিচার।

বিজ্ঞাপন

অদ্ভুত এক গণ-হিস্টিরিয়ার সূচনা

১৬৯২ সালের শুরুর দিকে ম্যাসাচুসেটসের সালেম ভিলেজে এক অদ্ভুত ঘটনার সূত্রপাত হয়। স্থানীয় যাজক স্যামুয়েল প্যারিসের ৯ বছর বয়সী মেয়ে এলিজাবেথ এবং ১১ বছর বয়সী ভাগ্নি অ্যাবিগেল উইলিয়ামস হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। তারা অদ্ভুত সব শব্দ করতে থাকে, ঘরের মেঝেতে হামাগুড়ি দিয়ে লুকিয়ে পড়ে এবং নিজেদের শরীরকে অদ্ভুতভাবে দুমড়েমুচড়ে ফেলে। সমকালীন চিকিৎসকেরা এই আচরণের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে না পেরে এক বাক্যে রায় দিয়ে দেন, এরা ‘ডাইনি’ বা অপশক্তির আছরের শিকার হয়েছে।

Puritan বা চরম রক্ষণশীল খ্রিষ্টান অধ্যুষিত সেই সমাজে শয়তান এবং ডাইনির অস্তিত্ব নিয়ে মানুষের মনে এমনিতেই গভীর ভয় ছিল। চিকিৎসকের এই মন্তব্যের পর পুরো শহরে যেন অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় এক চরম হিস্টিরিয়া। সেই ছোট মেয়েরা একে একে গ্রামের এমন কিছু মানুষের নাম বলতে শুরু করে, যাদের তারা স্বপ্নে বা অবাস্তব উপায়ে তাদের ওপর নির্যাতন করতে দেখেছে। এই অদ্ভুত এবং অদৃশ্য প্রমাণকেই আদালতে ‘স্পেক্ট্রাল এভিডেন্স’ (Spectral Evidence) বা অলৌকিক প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা শুরু হয়। আর এই গণ-হিস্টিরিয়ার প্রথম প্রধান শিকার হন ব্রিজেট বিশপ।

ব্রিজেট বিশপ কে এবং কেন তিনিই প্রথম লক্ষ্যবস্তু হলেন

ঐতিহাসিক নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, ব্রিজেট বিশপ ছিলেন স্বাধীনচেতা এবং কিছুটা ঠোঁটকাটা স্বভাবের একজন নারী। ১৬৯২ সালে যখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, তখন তার বয়স ছিল পঞ্চান্ন থেকে পঁয়ষট্টির মধ্যে। তিনি এডওয়ার্ড বিশপ নামের এক কাঠুরের সাথে তার তৃতীয় সংসারে ছিলেন। এর আগের দুই স্বামী মারা যাওয়ার কারণে প্রতিবেশীদের একাংশ তাকে বরাবরই বাঁকা চোখে দেখত। এমনকি তার দ্বিতীয় স্বামী জীবদ্দশায় অভিযোগ করেছিলেন যে ব্রিজেট একজন ভালো স্ত্রী নন এবং শয়তান নাকি তার শরীরে সরাসরি ভর করে!

প্যুরিটান সমাজের কঠোর এবং সনাতনী নিয়মকানুনের সাথে ব্রিজেটের জীবনযাপন একেবারেই মিলত না। তিনি জনসমক্ষে নিজের মতামত প্রকাশ করতেন, প্রতিবেশীদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে তর্কাতর্কিতে জড়াতেন এবং সাবাথ বা পবিত্র রবিবারেও স্বামীর সাথে ঝগড়া করার অপরাধে একবার আইনি শাস্তির মুখোমুখি হয়েছিলেন। তৎকালীন সমাজে নারীদের যতটুকু মৃদুভাষী ও বাধ্য থাকার নিয়ম ছিল, ব্রিজেট ছিলেন তার ঠিক উল্টো। এই স্বাধীনচেতা স্বভাব এবং সমাজের চোখে ‘আলাদা’ হওয়াই তাকে ডাইনি শিকারিদের জন্য সবচেয়ে সহজ এবং প্রথম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল।

আদালতের সেই অদ্ভুত বিচার

১৬৯২ সালের ২ জুন নবগঠিত বিশেষ আদালত ‘কোর্ট অব ওয়ের অ্যান্ড টার্মিনার’-এ ব্রিজেট বিশপের বিচার শুরু হয়। আদালতে ব্রিজেটের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো শুনলে আধুনিক যুগের যেকোনো মানুষের হাসি পেতে বাধ্য, কিন্তু তৎকালীন সময়ে তা ছিল জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। আদালতে সেই তথাকথিত ‘আক্রান্ত’ মেয়েরা হাজির হয়ে চিৎকার শুরু করে। ব্রিজেট যখনই বিচারকের দিকে তাকাতেন বা নিজের মাথা নাড়াতেন, মেয়েরা তখন মেঝেতে পড়ে গিয়ে ছটফট করত এবং দাবি করত যে ব্রিজেটের অদৃশ্য আত্মা বা প্রতিচ্ছবি তাদের শরীরে চিমটি কাটছে বা সুঁই ফোটাচ্ছে।

বিচারক জন হাথর্ন যখন ব্রিজেটকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কেন এই বাচ্চাদের কষ্ট দিচ্ছেন?’ ব্রিজেট তখন দৃঢ়ভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি নির্দোষ। আমি এই লোকদের চিনিও না, আর এই জায়গায় এর আগে কখনো আসিনি।’ কিন্তু আদালত তার এই আত্মপক্ষ সমর্থনকে পাত্তা দেয়নি। এর ওপর আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে প্রতিবেশীদের কিছু আজব সাক্ষ্য। এক প্রতিবেশী দাবি করেন, ব্রিজেটের আত্মা নাকি রাতে তার ঘরের দেয়ালে হেঁটে বেড়াত! আরেকজন দাবি করেন, ব্রিজেটের নজর লাগার কারণে তার শুকর ছানাগুলো মারা গেছে। সবচেয়ে বড় ‘প্রমাণ’ হাজির করা হয় যখন তার পুরোনো একটি বাড়ির দেয়ালের ভাঙা অংশ থেকে কিছু কাপড়ের পুতুল (Poppets) উদ্ধার করা হয়, যেগুলোর মাথায় পিন ফোটানো ছিল। সেই অন্ধ যুগে এই পুতুলগুলোকেই ব্ল্যাক ম্যাজিক বা ডাইনিবিদ্যার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরে নেয় আদালত।

১০ জুনের সেই কালো অধ্যায়

আদালতের সমস্ত নাটকীয়তা শেষে ব্রিজেট বিশপকে ডাইনিবিদ্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১৬৯২ সালের ১০ জুন, ম্যাসাচুসেটসের সালেম জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে শেরিল জর্জ করউইনের পাহারায় ব্রিজেটকে বের করা হয়। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় শহরের উপকণ্ঠে একটি উচু ঢিবির ওপর, যা ইতিহাসে ‘Gallows Hill’ বা ফাঁসির পাহাড় নামে পরিচিত।

চারপাশে তখন উৎসুক এবং আতঙ্কিত জনতার ভিড়। ব্রিজেট বিশপ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের নির্দোষিতার কথা চিৎকার করে বলে গিয়েছিলেন। তিনি কোনো মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হননি, কারণ তিনি জানতেন তিনি কোনো পাপ করেননি। কিন্তু অন্ধ কুসংস্কারের রাজত্বে জল্লাদ ও বিচারকদের মন গলেনি। ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দেওয়া হয় তার গলায়। দুপুরের আগেই ব্রিজেট বিশপের নিথর দেহ গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সালেম উইচ ট্রায়ালসের ইতিহাসে তিনিই ছিলেন প্রথম দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি। দুঃখের বিষয় হলো, ব্রিজেটের এই মৃত্যুর পর মানুষের ভুল ভাঙেনি, বরং এটি ছিল এক দীর্ঘ হত্যাকাণ্ডের শুরু মাত্র। এর পর একে একে আরও ১৯ জন মানুষকে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং ১ জনকে পাথর চাপা দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাদের প্রত্যেককেই ‘ডাইনিবিদ্যা’ (Witchcraft) এবং শয়তানের সাথে চুক্তি করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

ইতিহাসের ভুল অনুভব এবং আধুনিক সালেমের অনুশোচনা

ব্রিজেট বিশপের মৃত্যুর পর কয়েক শতাব্দী পার হয়ে গেছে। আধুনিক বিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে ১৬৯২ সালের সেই ঘটনাটি আসলে কোনো ডাইনিবিদ্যা ছিল না, বরং তা ছিল সামাজিকভাবে তৈরি হওয়া এক তীব্র মানসিক প্যানিক বা ম্যাস হিস্টিরিয়া। নিজের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া, ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানো কিংবা সমাজের শক্তিশালী পুরুষদের অবাধ্য হওয়া নারীদের দমানোর জন্য ‘ডাইনি’ তকমা দেওয়া ছিল একটি সহজ অস্ত্র।

ইতিহাসের এই কুখ্যাত ভুলকে শুধরে নিতে ম্যাসাচুসেটস সরকারকে অনেক দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। ঘটনার বহু বছর পর, ২০০১ সালে ম্যাসাচুসেটস আইনসভা আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বিল পাস করে ব্রিজেট বিশপসহ সালেম ট্রায়ালসে নিহত সমস্ত নিরপরাধ মানুষকে আইনিভাবে সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং কলঙ্কমুক্ত (Exonerated) ঘোষণা করে। আজ সালেম শহরে ব্রিজেট বিশপের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে এবং প্রতি বছর হাজারো পর্যটক সেখানে আসেন মানুষের তৈরি ইতিহাসের অন্যতম এক অন্ধ ও কালো অধ্যায়কে স্মরণ করতে, যা শুরু হয়েছিল এই ১০ জুন তারিখে।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর