রাতের ঢাকা যখন নিয়ন আলোয় সেজেগুজে ঘুমিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। ঠিক তখনই শহরের একটি নির্দিষ্ট কোণে কর্মজীবন শুরু হয়। সদরঘাটের বুড়িগঙ্গার পচা জলের গন্ধ আর সস্তা পারফিউমের তীব্র সুবাস যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, ঠিক সেই গলির এক চিলতে ঘরে বসে কথা হচ্ছিল চম্পার (ছদ্মনাম) সাথে। মলিন বিছানার চাদর, দেয়ালে ঝুলতে থাকা একটা ভাঙা আয়না আর সস্তা প্রসাধনীতে ঠাসা টেবিলটাই চম্পার পুরো পৃথিবী। বয়স চব্বিশ কি পঁচিশ, কিন্তু চোখের নিচের কালচে দাগ আর ক্লান্ত চাউনি বলে দেয়, জীবনের হিসেবটা এই বয়সের চেয়ে অনেক বেশি ভারী।
চম্পা তার জীবনের গল্প বলতে গিয়ে ফিরে যান সাত বছর আগের এক ঝড়ের রাতে। তখন তিনি নেত্রকোনার এক প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ এক তরুণী। বাবা ছিলেন দিনমজুর, অভাবের সংসারে দুবেলা ঠিকমতো ভাত জুটত না। সেই সুযোগটাই নিয়েছিল গ্রামের এক চেনা প্রতিবেশী। শহরে একটি পোশাক কারখানায় ভালো বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়ে চম্পাকে নিয়ে আসা হয়েছিল এই ঢাকায়। কিন্তু বাস থেকে নামার পর কারখানার বদলে তার ঠিকানা হয়েছিল এই নিষিদ্ধ গলির একটি অন্ধকার কুঠুরিতে। চম্পা জানান, প্রথম তিন দিন তাকে একটা ঘরে আটকে রেখে খাবার দেওয়া হয়নি, কেবল চলেছে অমানুষিক নির্যাতন।
নিজের সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা মনে করে চম্পা বলেন, প্রথম যখন এই জগতে পা দিতে বাধ্য করা হয়েছিল, তখন মনে হতো প্রতিদিন আমি একটু একটু করে মরে যাচ্ছি। প্রথম কয়েক মাস প্রতি রাতেই মনে হতো বুড়িগঙ্গায় গিয়ে ঝাঁপ দিই, কিন্তু বাড়িতে রেখে আসা বৃদ্ধ মা আর ছোট বোনটার মুখ মনে পড়লে পা দুটো থমকে যেত।
চম্পা জানান, বাড়ি থেকে মাঝেমধ্যেই ফোন আসে টাকার জন্য, প্রতি মাসে নিয়ম করে টাকা পাঠান। কিন্তু বাড়ির মানুষ আজও জানে, তাদের মেয়ে ঢাকার একটা বড় গার্মেন্টসে দিনরাত ওভারটাইম খেটে টাকা রোজগার করছে।
এই পেশার ভেতরের নির্মম বাস্তবতার কথা বলতে গিয়ে চম্পার গলা কিছুটা বুজে আসে। তিনি জানান, বাইরের মানুষ মনে করে এখানে কেবলই টাকার খেলা, কিন্তু ভেতরের জগৎটা যে কতটা ভয়ঙ্কর, তা কেউ দেখে না। মাঝেমধ্যেই গভীর রাতে মাতাল খদ্দেরদের মারধর সহ্য করতে হয়, রোগব্যাধি হলেও চিকিৎসা পাওয়ার উপায় থাকে না। আমাদের কোনো অসুখ হলে ডাক্তার দেখাতে যাওয়াও একটা বড় যুদ্ধ, কারণ সমাজের মানুষ আমাদের সাধারণ মানুষ হিসেবে গণ্য করে না। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় যখন নিজের আত্মপরিচয় নিয়ে বাঁচতে পারি না, কোনো উৎসব বা ঈদেও বাড়ি যাওয়ার মুখ থাকে না।
চম্পার গল্পটা এতোটুকুই। হয়তো আরও কিছু ছিলো। কিন্তু চম্পাও এই পৃথিবীর একজন ব্যস্ত মানুষ। সে ১০ মিনিট বলেও ১৭ মিনিট সময় দিয়েছিলো আমাকে। এর মধ্যেই সে তার সাজগোজের কাছটাও সারছিলো। কিন্তু গল্প করতে করতেই,রাত বাড়ে, জানালার বাইরে খদ্দেরদের আনাগোনার শব্দ আর চিৎকার জোরালো হতে থাকে।
ডায়েরিটা নিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছি, তখন চম্পা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক মাখছেন। আরেকটা নতুন রাতের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি। বিদায় নেওয়ার সময় দরজার পাশে দাঁড়িয়ে চম্পা মৃদু হেসে বলেন, বাবুদের কাছে আমাদের শরীরের দাম আছে, কিন্তু আমাদের মনের কান্নার কোনো দাম নেই। পরজন্মে যদি সত্যি কিছু থাকে, তবে আমি আর মানুষ হয়ে জন্মাতে চাই না, অন্তত মেয়ে হয়ে তো নয়ই।
চম্পার হাতে তখনও সেই লিপস্টিক। যা দিয়ে প্রতি রাতে ক্ষত ঢেকে রাখে। আবার এই লিপস্টিক দিয়েই খদ্দের ডেকে নিজের আয় রুজি করে নেয়। কিন্তু লিপস্টিকের আড়ালে লুকানো দীর্ঘশ্বাসের গল্পটি সবাই জানেনা। সেই গল্পটি সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম, আরেকটি নতুন গল্পে খোঁজে।