Tuesday 02 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ইতিহাস ও বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক যৌনকর্মী দিবস

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২ জুন ২০২৬ ১৫:৫৩

প্রতি বছর ২ জুন বিশ্বজুড়ে একটি বিশেষ দিন হিসেবে পালিত হয়, যা আন্তর্জাতিক যৌনকর্মী দিবস নামে পরিচিত। আপাতদৃষ্টিতে এই দিনটিকে অনেকে সাধারণ একটি দিবস মনে করলেও, এর পেছনে রয়েছে অধিকার আদায়ের এক দীর্ঘ এবং রক্তাক্ত ইতিহাস। আজ থেকে প্রায় অর্ধশতক আগে ফ্রান্সের লিঁও শহরে যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, তা সময়ের পরিক্রমায় আজ বিশ্বব্যাপী প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার রক্ষার এক বড় প্রতীকে পরিণত হয়েছে। পেশাগত নিরাপত্তা, আইনি স্বীকৃতি এবং সমাজের মূলধারায় মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার তাগিদে প্রতি বছর এই দিনে বিশ্বজুড়ে যৌনকর্মীরা তাদের দাবিদাওয়া পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সাথে রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

এই দিবসের উৎপত্তির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের ২ জুন ফ্রান্সের লিঁও শহরের ‘সেন্ট নিজিয়ার’ চার্চে প্রায় একশত যৌনকর্মী একত্রিত হয়ে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেছিলেন। সেই সময়ে পুলিশি নির্যাতন, মাত্রাতিরিক্ত জরিমানা এবং কর্মক্ষেত্রে চরম অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে এটি ছিল তাদের একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ। তৎকালীন সময়ে ফ্রান্সে যৌনকর্মীদের ওপর পুলিশের পক্ষ থেকে নানামুখী চাপ তৈরি করা হয়েছিল, যার ফলে তারা গোপনে এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছিলেন। এই কঠোর অবস্থানের কারণে বেশ কয়েকজন যৌনকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, কিন্তু প্রশাসন সেই অপরাধীদের দমনে কার্যকর কোনো ভূমিকা নেয়নি। এই বঞ্চনা ও অনিরাপত্তার প্রতিবাদেই তারা চার্চের ভেতরে আশ্রয় নেন এবং তাদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হন।

লিঁও শহরের সেই চার্চে শুরু হওয়া আন্দোলনটি টানা আট দিন ধরে চলেছিল। আন্দোলনকারীরা দাবি করেছিলেন যাতে তাদের কাজের পরিবেশ নিরাপদ করা হয় এবং পুলিশি হয়রানি বন্ধ করা হয়। যদিও আট দিন পর পুলিশ অত্যন্ত জোরালোভাবে সেই চার্চ থেকে তাদের বের করে দেয়, কিন্তু এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে একটি বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি করতে সক্ষম হয়। এই আন্দোলনের পর থেকেই মূলত বিশ্বব্যাপী যৌনকর্মীদের অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় এবং ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে এই জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার সংগঠন গড়ে ওঠে। সেই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণ করেই পরবর্তী সময়ে প্রতি বছর ২ জুন আন্তর্জাতিকভাবে এই দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এই দিবসটি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করা হয়। বাংলাদেশে এই পেশার সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং অধিকার রক্ষা সংগঠনগুলো সেমিনার, র্যালি ও মানববন্ধনের আয়োজন করে থাকে। বাংলাদেশের আইন ও সমাজ ব্যবস্থায় এই জনগোষ্ঠীর নানাবিধ সংকট রয়েছে। বিশেষ করে আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং তাদের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অধিকার কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন যেন এই প্রান্তিক মানুষদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধায় তাদের সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়।

এই বিশেষ দিবসে আন্তর্জাতিক অধিকার রক্ষা আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিরা প্রায়শই তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অব সেক্স ওয়ার্ক প্রজেক্টসের একজন মুখপাত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, এই দিবসটি কেবল উদযাপনের জন্য নয়, এটি মূলত বিশ্বজুড়ে আমাদের পেশাগত নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষার দাবি জানানোর একটি দিন। তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠী নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে, যা বন্ধ হওয়া জরুরি। তিনি আরও বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সমাজ আমাদের মৌলিক মানবাধিকারের স্বীকৃতি না দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই বৈষম্যের অবসান ঘটবে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাও এই জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়ে সবসময় গুরুত্ব দিয়ে আসছে। জাতিসংঘের এইডস বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইডসের একজন কর্মকর্তা এক আলোচনা সভায় জানান, সামাজিক কুসংস্কার এবং আইনি জটিলতার কারণে এই জনগোষ্ঠীর মানুষেরা প্রায়শই স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হন। তিনি বলেন, এইচআইভি প্রতিরোধ এবং সার্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই মানুষদের মূলধারার স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরও বলেন, তাদের অধিকার রক্ষা করা গেলে সমাজের সার্বিক জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর