জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে লেখার শুরুতে একটা গল্প মনে পড়ছে, সেই গল্পটা দিয়ে শুরু করি। নায়মোলার জার্মান নৌবাহিনীর একজন দুর্ধর্ষ সাবমেরিন অধিনায়ক ছিলেন। পরে তিনি চিন্তাবিদ ও লেখক হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন এবং হিটলারের নাৎসিদের দ্বারা কারারুদ্ধ হন। নায়মোলার অভিমত, জার্মান জাতি নিষ্ক্রিয় ছিল বলেই হিটলার তাদের স্তব্ধ করে দিয়ে নাৎসি শাসন চালু করতে পেরেছিলেন।
নায়মোলার ভাষায় মানুষ স্বার্থপরতা আর নিজে বিপদে পড়ার আগ পর্যন্ত অনেক বিপদকে নিজের বিপদ মনে না করলে দিনশেষে কেউ নিরাপদ থাকেনা। নায়মোলার তার গল্পটা বর্ণনা করেছেন ঠিক এভাবে— ‘প্রথমে ওরা এলো কমিউনিস্টদের ধরতে। আমি প্রতিবাদ করিনি, কেননা আমি কমিউনিস্ট ছিলাম না। তারপর তারা সোস্যালিস্টদের ধরতে এসেছিল, তখনো আমি প্রতিবাদ করিনি, কারণ আমি সোস্যালিস্ট ছিলাম না। তারপর তারা এলো ট্রেড ইউনিস্টদের ধরতে, আমি প্রতিবাদ করিনি, কারণ আমি ট্রেড ইউনিয়নপন্থী ছিলাম না। তারপর তারা এলো ইহুদিদের ধরতে, আমি প্রতিবাদ করিনি, কারণ আমি ইহুদি ছিলাম না। তারপর ওরা আমাকে ধরতে এলো, তখন আর আমার হয়ে প্রতিবাদ করার কেউ ছিল না।’
বর্তমানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া রাজনৈতিক দলগুলো ফ্যাসিবাদের দোসরদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করার পরিবর্তে তারা পরস্পরের নিজেদের দোষক্রুটি অনুসন্ধানে ব্যস্ত। ২০২৪ সালের এক রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পেয়েই দলগুলো পরস্পরের প্রতি দিনরাত বিষেদাগার করছেন। অথচ গত ১৫ বছর তারা যে মজলুম ছিলেন, তা আজ ভুলে একে অপরকে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী, রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী বলে গালমন্দ করছেন। এই অবস্থা চলতে থাকে এবং জুলাই পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ না হয়ে নিজেদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে, তাহলে উপরের গল্পের মতোই সবার অবস্থা হবে।
এদিকে দেখতে দেখতে আজ জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। জুলাই বিপ্লবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র ত্যাগ অনেক বেশি। জুলাই বিপ্লবে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের দুই শতাধিক নেতাকর্মী জীবন দিয়েছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তীতে বিএনপি’র চেয়ারপার্সন ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পান। বিএনপির’র তৎকালীন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মামলা ও সাজা প্রত্যাহার হলে ১৬ বছর পর তিনি দেশে ফিরেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কারণেই ১৮ বছর পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব হয়েছে। যে নির্বাচনের মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবের অন্যতম স্টেকহোল্ডার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল জনসমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন।
অন্যদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অবদানও অস্বীকার করা যায় না। এই জুলাই আন্দোলনে রাজপথে দলটির অনেক নেতাকর্মী জীবন দিয়েছেন। এর প্রতিদান দলটি পেয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও জুলাই পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে ৭৭টি আসনে বিজয়ী হয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। একইসঙ্গে দলটির ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী এ টি এম আজহারুল ইসলাম মুক্তি পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন ও উচ্চ আদালতে দলটির নিবন্ধন বাতিল হলেও জুলাই পরবর্তী সময়ে নিবন্ধন ফেরত পেয়েছে। একইসঙ্গে গুম, খুন, ক্রসফায়ার, মিথ্যা ও গায়েবি মামলা, হামলার শিকার দলটির লাখ লাখ নেতাকর্মী মুক্তি পেয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান না আসলে দলটি তা কল্পনাও করতে পারতো না হয়তো।
একই সময়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেকটা তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। যে দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী রাজপথে জীবনবাজি রেখে আন্দোলন সংগ্রাম করে ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট হাসিনা সরকারকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছেন। জুলাই পরবর্তী সময়ে তাদের অবদানের কথা স্বরণ করে অন্তবর্তীকালীন সরকারের তিনজন উপদেষ্টা ছিল আন্দোলনকারী ছাত্রদের পক্ষ থেকে। পরবর্তীতে তারা দল গঠন করলে নাহিদ ইসলাম বিরোধী দলের উপনেতাসহ তাদের দলের বেশ কয়েকজন নেতা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আর এটি সম্ভব হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র জনতার পাশে ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং পেশাজীবিদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কারণে। ছাত্র জনতার পাশাপাপশি সকল দল, মত ও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ঝাপিয়ে পড়ার কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ সংগঠন) নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনরোষের ভয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। হাসিনার দীর্ঘ ১৬ বছর শাসন আমলে বিরোধী দলের সকল আন্দোলন সংগ্রাম ব্যর্থ হলেও জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যাসিষ্ট সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য, জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পরে এসে আমরা জুলাই ঐক্যকে ভুলে যেতে বসেছি। ইতিমধ্যে পলাতক ফ্যাসিষ্ট ও তাদের এদেশে থাকা প্রকাশ্যে ও গুপ্ত দোষররা জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। এইক্ষেত্রে তারা কিছুটা সফলও হয়েছে। পতিত ফ্যাসিষ্ট সরবকারের লোকজন প্রথমে অন্তবর্তীকালীন সরকার তথা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সমালোচনা শুরু করে। তারা নোবেল বিজয়ী ইউনূসের শাসন আমলকে অবৈধ বলার চেষ্টা করেছে। অথচ অন্তবর্তীকালীন সরকার অবৈধ হলে জুলাই পরবর্তী দেড় বছরের শাসন আমলের নির্বাচনসহ সব কিছু অবৈধ হয়ে যায়। জুলাই বিপ্লবের পক্ষের শক্তির অনেকেই না বুঝে ফ্যাসিষ্ট সমর্থকদের ফাঁদে পা দিয়েছেন।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, আমরা যদি লক্ষ্য করি যে কারা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের সমালোচনা করছেন, কারা এনসিপি বা জামায়াতের সমালোচনা করছেন। আমরা যদি নাম ধরে ধরে তাদের প্রোফাইল ঘেঁটে দেখি, দেখবো তাদের ৮০ শতাংশই বিগত সরকারের কর্মী সমর্থক অথবা সুবিধাভোগী। বাকি ২০ শতাংশের একটা বড় অংশ ফ্যাসিষ্ট সরকারের কর্মী সমর্থকদের অপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে নিজেরাও অপ্রচারে লিপ্ত হয়েছেন। এই সমালোচকরা চাচ্ছেন আপতত ড. ইউনূস সমর্থক, জামায়াত, এনসিপি ও অনান্য ইসলামী দলগুলোকে বিএনপি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে রাজনীতিতে বিএনপি’কে একা করে দেয়া। এটা সফল হলে পরবর্তীতে তারা বিএনপি’র ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। কারণ জুলাই শক্তি যদি আগামীতেও ঐক্যবদ্ধ থাকে তাহলে ফ্যাসিষ্টদের রাজনীতিতে পুনর্বাসনের আর কোন সুযোগ থাকবে না। এদিকে জুলাই শক্তি বিভাজন হলে এই বিভাজিত শক্তির কোন এক পক্ষের সাথে যদি ফ্যাসিষ্টরা মিলে যায়, কিংবা ভোটের রাজনীতির কারণে জুলাই বিভাজিত শক্তির একটি অংশ যদি নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগকে সাথে নেয় তখন অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ফলে কোনভাবে যদি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জড়িত শক্তির মাঝে বিভাজন বাড়ে, এই সুবিধা ফ্যাসিষ্টরা নিবেই।
ইতিমধ্যে ইউনূস সরকার, এনসিপি ও জামায়াত ইসলামীসহ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূলবোধে বিশ্বাসী তথা জুলাই পক্ষের শক্তির সাথে বিএনপি’র দূরত্ব কিছুটা বেড়েছে। যদিও এইক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেশ দক্ষতার সাথে বিরোধী দলের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ১২ ফেব্রুয়ারি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেওয়ার আগেই ১৫ ফেব্রুয়ারি তার নির্বাচনী মাঠের প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের সঙ্গে তাদের বাসভবনে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন। শুধু তাই নয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পরেও সংসদ ও সংসদের বাহিরে তারেক রহমান একাধিক বিরোধী দলীয় নেতা এবং সংসদ উপনেতার সাথে বৈঠক করেছেন। এতে বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই পক্ষের শক্তিকে কতটা মূল্যায়ন করছেন এবং তিনি সবাইকে নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছেন। যদিও বিএনপি’র অনেক কেন্দ্রীয় নেতার বিবৃতি বক্তব্যে এই ধরনের সৌহাদ্যপূর্ণ আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর শেষে দেশে ফিরলে তার প্রথম বিদেশ সফরের সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের সমর্থনে গৃহীত ওই প্রস্তাবে সফরকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটাও সরকারের প্রতি বিরোধী দলের সমর্থন ও আস্থার অন্যতম নজির স্থাপিত হয়েছে। অন্যদিকে ১৯৯৯ সাল থেকে বিএনপি, জামায়াত জোটবদ্ধভাবে একসাথে একমঞ্চে বসে আন্দোলন সংগ্রাম করেছে। ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৮ সালের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামীসহ সমমনা কয়েকটি দল জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেছে। আবার ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বিএনপি জামায়াত একসাথে বর্জন করেছিল। শুধু তাই নয় ২০২৬ সালে যদি আওয়ামীলীগের নির্বাচন করার কোন সুযোগ থাকতো, তাহলেও হয়তো বিএনপি ও জামায়াত জোটগতভাবেই আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতো। ফলে যে কোন মূল্যেই জুলাই ঐক্য ধরে রাখতে হবে। এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিভিন্ন বড় দলের পাশাপাশি ছোট ছোট রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, ছাত্র-শিক্ষক ও পেশাজীবিদের অবদান ও অর্জন কোনটাই কম নয়। ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরের গণ অধিকার পরিষদ, জুনায়েদ সাকির গণসংহতি আন্দোলন, আন্দালিব রহমান পার্থর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিশ, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টি, খেলাফত আন্দোলন, হেফাজতে ইসলামসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল জুলাই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এতে করে জুলাই পরবর্তীতে এমপি, মন্ত্রীসহ অনেক পদ পদবি সুযোগ সুবিধা পেয়েছেন। জুলাই না আসলে এটা কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। অন্যদিকে জুলাই পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারী চাকরিজীবিদের নতুন পে স্কেলের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এগুলো জুলাই বিপ্লবের সুফল।
লেখক: হেড অব নিউজ, দৈনিক সারাবাংলা ও সারাবাংলা ডটনেট