Friday 21 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

অনলাইন ক্লাসের আবর্তে শৈশব: প্রযুক্তির আশীর্বাদ নাকি আসক্তির মরণফাঁদ?

মীর আব্দুল আলীম
৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:৫২

সম্প্রতি জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অজুহাতে শিক্ষা কার্যক্রমকে পুনরায় অনলাইনে স্থানান্তরের একটি আলোচনা শুরু হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে একে আধুনিক ও সময়োপযোগী সমাধান মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে মারাত্মক কিছু সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি। করোনাকালীন অনলাইন ক্লাসের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের স্মৃতিতে এখনো অমলিন। সেই সময়টি আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল শিক্ষার সুযোগ আনেনি, বরং উপহার দিয়েছিল মোবাইল আসক্তি, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অপসংস্কৃতির হাতছানি আমরা স্পষ্ট লক্ষ্য করেছি। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অনলাইন ক্লাসের যৌক্তিকতা এবং এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যালোচনা পেশ করা হলো।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড, আর সেই মেরুদণ্ড যদি কৃত্রিম ও যান্ত্রিক নির্ভরতার কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে বাধ্য। বর্তমান বিশ্বে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও জ্বালানি সংকটের প্রভাবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা ভাবা হচ্ছে। কিন্তু সেই সাশ্রয় যদি হয় কোমলমতি শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশকে রুদ্ধ করে, তবে তা হবে আত্মঘাতী। করোনাকালীন সময়ে আমরা দেখেছি, শ্রেণিকক্ষের বিকল্প হিসেবে মোবাইল বা কম্পিউটার যখন শিক্ষার্থীর একমাত্র সঙ্গী হয়, তখন পড়াশোনার চেয়ে ‘অন্য কিছু’তেই তারা বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই আবারও অনলাইন ক্লাসের পথে হাঁটার আগে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সরকারকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। শিক্ষা কেবল তথ্য সংগ্রহের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি জীবনমুখী ও সামাজিক প্রক্রিয়া। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে আমেরিকা-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের ফলে সৃষ্ট বিশ্ববাজারে তেল ও জ্বালানি সংকটের ঢেউ বাংলাদেশেও লেগেছে। সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে পুনরায় শিক্ষা কার্যক্রমকে অনলাইনে স্থানান্তরের কথা ভাবছে। আপাতদৃষ্টিতে একে প্রযুক্তিবান্ধব সমাধান মনে হলেও, করোনাকালীন অভিজ্ঞতা আমাদের বলে অনলাইন ক্লাস মানেই কেবল পাঠদান নয়, বরং এটি একটি প্রজন্মের জন্য মোবাইল আসক্তি, নৈতিক অবক্ষয় এবং মানসিক অসুস্থতার প্রবেশদ্বার। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিনিময়ে আমরা যদি আমাদের শিশুদের শৈশব ও মেধা বন্ধক দিয়ে দিই, তবে সেই সাশ্রয়ের মূল্য হবে অনেক চড়া। এই সংকটকালে অনলাইন ক্লাসের ভয়াবহতা এবং এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে নির্মোহ পর্যালোচনার সময় এসেছে।

অনলাইন ক্লাসের সবচেয়ে বড় ক্ষত হলো ডিভাইসের প্রতি অনিয়ন্ত্রিত আসক্তি। করোনাকালে আমরা দেখেছি, ‘ক্লাস করছি’ বলে স্মার্টফোন বা কম্পিউটার হাতে নিয়ে শিক্ষার্থীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইউটিউব, শর্টস বা গেমিংয়ের নেশায় ডুবে থাকে। ডোপামিন হরমোনের এই কৃত্রিম নিঃসরন তাদের এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, ফোন ছাড়া তারা জীবন কল্পনা করতে পারে না। পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ হারিয়ে তারা ‘ভার্চুয়াল জম্বি’তে পরিণত হচ্ছে। অফলাইন ক্লাসে শিক্ষক যেখানে সরাসরি তদারকি করতে পারেন, অনলাইনে সেই সুযোগ নেই। ফলে পড়াশোনা হয়ে যায় গৌণ, আর ডিভাইসের অন্ধকার জগত হয়ে ওঠে মুখ্য। ইন্টারনেট একটি উন্মুক্ত মহাসমুদ্র, যেখানে ভালো ও মন্দের কোনো সীমারেখা নেই। অনলাইন ক্লাসের সময় শিশুদের হাতে যখন ইন্টারনেটসহ ডিভাইস তুলে দেওয়া হয়, তখন তারা অজান্তেই পর্নোগ্রাফি, সাইবার বুলিং এবং ভিনদেশি নেতিবাচক সংস্কৃতির (যেমন- ওয়েস্টার্ন কালচার) সংস্পর্শে চলে আসে। আমাদের পারিবারিক ও দেশীয় সংস্কৃতির যে শিষ্টাচার, তা ডিজিটাল এই ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল মিডিয়ার গোলকধাঁধায় পড়ে অনেক শিক্ষার্থী কিশোর অপরাধের মতো অন্ধকার পথেও পা বাড়াচ্ছে, যা করোনাকালীন সময়ে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। এর প্রভাবে শিক্ষাহ শারীরিক স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। দীর্ঘক্ষণ একনাগাড়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের কর্নিয়ার ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, এর ফলে ‘কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম’ এবং অল্প বয়সে চশমা ব্যবহারের হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এছাড়া দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে শারীরিক পরিশ্রম না হওয়ায় শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বা ওবেসিটি দেখা দিচ্ছে। হাড়ের গঠন দুর্বল হওয়া, মেরুদণ্ডে ব্যথা এবং ঘুমের চক্র (ঝষববঢ় ঈুপষব) ব্যাহত হওয়া অনলাইন ক্লাসের একটি স্থায়ী শারীরিক উপহার, যা পরবর্তী জীবনে তাদের পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

মানুষ সামাজিক জীব। একটি শিশু স্কুলে গিয়ে তার বন্ধুদের সাথে যে মেলামেশা, ঝগড়া কিংবা মিলমিশ করে, তা তার মানসিক পরিপক্কতার জন্য অপরিহার্য। অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থী ঘরে বন্দি হয়ে যায়। এতে তাদের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা, একাকীত্ব এবং চরম বিষণ্ণতা (উবঢ়ৎবংংরড়হ) বাসা বাঁধে। সহপাঠীদের সান্নিধ্য ছাড়া বেড়ে ওঠা এই শিশুরা ভবিষ্যতে সমাজে খাপ খাইয়ে নিতে সমস্যার সম্মুখীন হবে। সরাসরি মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস হারিয়ে তারা এক কৃত্রিম সামাজিকতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। তাছাড়া আমাদের দেশের বৃহত্তর অংশ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত। তাদের জন্য একটি মানসম্মত স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ কেনা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তেলের দাম এবং নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই কঠিন সময়ে আবারও অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত মানে হলো দরিদ্র অভিভাবকদের ওপর কয়েক হাজার টাকার বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। এর ওপর রয়েছে প্রতি মাসের উচ্চমূল্যের ইন্টারনেট ডেটা খরচ। এই ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে অনেক পরিবারকে পুষ্টিকর খাবারের বাজেট কাটছাঁট করতে হয়, যা পরোক্ষভাবে শিশুদের পুষ্টিহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সরকার বলছে অনলাইন ক্লাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এসি বা লাইট বন্ধ হলেও লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ঘরে পৃথক পৃথক রাউটার, কম্পিউটার চার্জিং এবং ফ্যান-লাইট জ্বলবে। জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপের কোনো টেকসই হ্রাস এতে ঘটবে না, বরং বিকেন্দ্রীকরণ হবে। পাশাপাশি ইন্টারনেটের জন্য যে বিপুল পরিমাণ ব্যান্ডউইথ ও এনার্জি খরচ হবে, তার খরচ ও পরিবেশগত প্রভাব হিসেবে নিলে এটি সাশ্রয়ের চেয়ে ব্যয়বহুল ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পদ্ধতি হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। অনলাইন ক্লাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সরাসরি কোনো ‘ইন্টারেকশন’ থাকে না। ভিডিও ক্যামেরা বন্ধ রেখে শিক্ষার্থী ঘুমাচ্ছে না গেম খেলছে, তা বোঝার কোনো উপায় শিক্ষকের নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা কেবল উপস্থিতির (অঃঃবহফধহপব) জন্য লগ-ইন করে থাকে। এর ফলে পাঠ্যবইয়ের মূল নির্যাস তারা গ্রহণ করতে পারে না। দীর্ঘ মেয়াদে এটি একটি ‘অটোপাস’ প্রজন্মের মতো অযোগ্য ও সার্টিফিকেট-ধারী মেধাহীন জনগোষ্ঠী তৈরি করবে, যারা প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকতে পারবে না।

বাংলাদেশের সব অঞ্চলে ইন্টারনেটের গতি সমান নয়। শহরের উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড পেলেও গ্রামের বা দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীরা নেটওয়ার্কের অভাবে ক্লাসে যুক্ত হতে পারে না। এই বৈষম্য শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত না করে অনলাইন ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত হবে সংবিধান স্বীকৃত সমান শিক্ষার অধিকারের পরিপন্থী। এর ফলে গ্রাম ও শহরের মেধার দূরত্ব আরও প্রকট হবে। স্কুল মানে কেবল চারটি দেয়াল নয়, স্কুল মানে খেলার মাঠ। অফলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা ও নানা সৃজনশীল কাজে অংশ নেয়। অনলাইন ক্লাস শিশুদের সেই মাঠ থেকে কেড়ে নিয়ে ড্রয়িং রুমের কোণে বসিয়ে দিচ্ছে। এতে তাদের সৃজনশীল চিন্তাশক্তি লোপ পাচ্ছে। খেলাধুলার অভাব তাদের শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। শিশুরা যখন মাঠের ফুটবল ছেড়ে ফোনের ‘ফিফা’ গেমে মগ্ন হয়, তখন তাদের প্রকৃত শৈশব সেখানেই মুখ থুবড়ে পড়ে। এছাড়া ভার্চুয়াল জগত মানুষকে স্বার্থপর ও অসামাজিক করে তোলে। অনলাইন ক্লাসের অযুহাতে ইন্টারনেটে সময় কাটাতে কাটাতে শিক্ষার্থীরা পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের সান্নিধ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতা কমে যাচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতা তাদের মধ্যে এক ধরণের ‘সোশ্যাল অ্যাংজাইটি’ তৈরি করছে। বড়দের শ্রদ্ধা আর ছোটদের স্নেহ করার যে চিরাচরিত বাঙালি সংস্কৃতি, তা ডিজিটাল স্ক্রিনের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। এই নৈতিক ধস একটি জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী অপূরণীয় ক্ষতি।

পরিশেষে বলা যায়, বিদ্যুৎ সাশ্রয় বা বৈশ্বিক সংকটের মোকাবিলা জরুরি, কিন্তু তার জন্য কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। করোনাকালীন অনলাইন শিক্ষা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, এর ক্ষতির পরিমাণ অর্জনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। সরকার যদি সাশ্রয়ী হতে চায়, তবে বিকল্প অনেক পথ খোলা আছে। সপ্তাহে তিন বা চার দিন ক্লাস করা, ক্লাসের সময় কমিয়ে আনা কিংবা শিফট পদ্ধতিতে সরাসরি পাঠদান পরিচালনা করা যেতে পারে। শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই মুখস্থ করা নয়, এটি জীবন গড়ার দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ। সেই বিনিয়োগকে প্রযুক্তির আসক্তির কাছে বলি দেওয়া হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আশা করি, নীতিনির্ধারকরা জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে অনলাইন ক্লাসের পরিবর্তে গঠনমূলক ও বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। শিক্ষার্থীদের হাতে ডিভাইস নয়, বরং বই আর খেলার মাঠই ফিরে আসুক এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক, মহাসচিব- কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ

সারাবাংলা/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর