ঢাকা: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে হেরোইন উদ্ধারের ২২টি মামলায় দুই দিনে (গত ১১ ও ১২ মার্চ) ২৩ আসামিকে ছয় মাসের জামিন দিয়েছেন বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী এবাদত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। মামলাগুলোতে হেরোইন (মাদক) উদ্ধারের পরিমাণ কমপক্ষে ৫০ গ্রাম থেকে ১ হাজার ৫৩ গ্রাম পর্যন্ত উল্লেখ আছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, এসব মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৩ মার্চ ও গতকাল (১৪ মার্চ) দুই দিনে হেরোইনের উদ্ধারের ২২টি মামলায় ২৩ জন আসামির জামিন আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছেন বিচারপতি এম, ইনায়েতুর রহিমের চেম্বার জজ আদালত।
পরে এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার নিজ কার্যালয়ে ব্রিফিং করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পি, এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এ রকম মামলায় আসামিদের জামিন পাওয়ার বিষয়টি খুব আশ্চর্যজনক মনে হয়েছে। জামিনের এসব ঘটনায় আশ্চর্য হয়ে গেলাম। এত পরিমাণ মাদক পাওয়া গেছে, এই মামলাগুলোতে সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। এটাতে জামিন হয়ে যায়! এটা (জামিন) আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। এত বেশি পরিমাণ মাদকের মামলায় এর আগে জামিন হতে দেখিনি। এক দিন বা দুই দিনে এতগুলো জামিন হয়ে গেছে, খুব হতাশাজনক মনে হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জামিনের ক্ষেত্রে আদালতকে এই ধরনের সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে, এই মামলায় আসামির খালাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বিচারক হিসেবে তার যে দায়িত্ব আছে, সেই দায়িত্বটা তিনি দেখবেন, আইন দেখবেন। ওনার (বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি) বিবেচনায় উনি সঠিক মনে করেছেন। কিন্তু আমাদের বিবেচনায় এটা ঠিক হয়নি।’
এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘মাদকের মামলা নিয়ে আমরা এত পরিমাণ কথা বলছি। এখন এ ধরনের মামলায় যদি আসামিকে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সমাজের কী অবস্থা হবে? এটা আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। মাদকের মামলাকে অন্য মামলার সঙ্গে একই তুলনায় বিচার করা যাবে না। মাদকের মামলাগুলো কঠোরভাবে দেখতে হবে এই কারণে যে, মাদক একটা সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মানুষকে শেষ করে দিচ্ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর আইন করেছে। মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সেই মৃত্যুদণ্ডের বিধান যেখানে আছে, সেখানে জামিনের ক্ষেত্রেও আদালতকে তার বিশ্লেষণটা সঠিকভাবে করতে হবে। জামিনের ক্ষেত্রে দুই বছর জেলে আছে, ছয় মাস জেলে আছে, এটা কোনো কারণ হতে পারে না।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা যেহেতু আপিল বিভাগে গিয়েছি, আমাদের কাছে মনে হয়েছে উনি (বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক) সঠিকভাবে বিচারটা করেননি। আমাদের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জামিনের বিরোধিতা করেছেন। শুনানি করেছেন। কিন্তু আদালত ওনার বক্তব্য আমলে না নিয়ে জামিন দিয়েছেন। উনি (বিচারপতি) তার বিচারিক ক্ষমতাকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করেননি।’
বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নজরে আনা হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘কোনো মামলায় আমরা যদি মনে করি যে, সঠিকভাবে বিচার হয়নি, আইন অনুযায়ী আমাদের যে বিধান আছে, আমরা আপিল করি। আমরা আপিল করেছি। এটা তো কোর্টে (আপিল বিভাগ) আসবেই। আজ (গতকাল) চেম্বার জজ ফিক্সড (আপিল বিভাগে) করে দিয়েছেন। এখন কোর্ট নিজেরাই দেখবে। মামলাগুলো যখন শুনানিতে আসবে তখন নিশ্চয়ই তাদের (আপিল বিভাগ) দৃষ্টিগোচরে আসবে।’
হিরোইন উদ্ধারের ২২টি মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২২-এর ১৯ ডিসেম্বর নাটোরের উত্তর বড়গাছা এলাকায় ১ হাজার ৫৬ গ্রাম (১ কেজি ৫৬ গ্রাম) হেরোইন উদ্ধারের পর মোস্তাকিম হোসেন মুন্না (৩২) ও মো. শাহাদাৎ আলী নামে দু’জনকে আসামি করা হয়। এ ঘটনায় ২০ ডিসেম্বর নাটোর সদর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলা হয়। গত ১১ মার্চ বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ শাহাদাৎ আলীকে ছয় মাসের জামিন দেন। তবে তার জামিনের আদেশের ওপর গত ১৩ মার্চ আট সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দেয় চেম্বার আদালত।
এছাড়া গত বছরের ২২ জানুয়ারি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা থেকে ২০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় মো. আল আমিন, ২০২১ সালের ৮ জুন ঢাকার শাহজাহানপুর থেকে ৩০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় মো. শহীদুল ইসলাম, ২০২৩ সালের ২৮ এপ্রিল গাইবান্ধার পলাশবাড়ি উপজেলা থেকে ২৭ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় মাহতাব আলী, ২০২২ সালের ১ মার্চ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে ৫০০ গ্রাম হেরোইনের উদ্ধারের মামলায় খোদেজা বেগম, ২০২২ সালের ২ নভেম্বর নাটোর সদর উপজেলা থেকে ৫০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় মো. সেলিম রেজা, ২০২২ সালের ২৫ মার্চ সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা থেকে ১০৩ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় মো. মুকুল আলী, ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলা থেকে ৮০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় আব্দুল খালেক, ২০২২ সালের ৩ নভেম্বর গাজীপুর সদর থেকে ৩১৫ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় মো. আওলাদ হোসেন, ২০২২ সালের ১৫ জানুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা থেকে ২০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় মো. আবু সাঈদ এবং ২০২২ সালের ১২ নভেম্বর নাটোরের সদর উপজেলা থেকে ৪৪ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় মো. মাসুদ মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। তারা সবাই গত ১১ মার্চ বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ থেকে ছয় মাসের জামিন পান। পরে জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ১৩ মার্চ তাদের জামিন আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন আপিল বিভাগের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের চেম্বার জজ আদালত।
গত বছরের ২৫ মে কক্সবাজারের ঝিলংজার খুরুলিয়া দরগাপাড়ায় কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের একটি কমিউনিটি সেন্টারের সামনে থেকে শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসে তল্লাশি চালিয়ে ৯৩০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় করা মামলায় আসামি করা হয় মো. এমরান (৩৮) ও নুরুল হক বাবুলকে (৪১)। গত ১১ মার্চ হাইকোর্টের ওই বেঞ্চে জামিন পান এমরান। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে গত ১৩ মার্চ এমরানের জামিনের ওপর স্থগিতাদেশ দেয় চেম্বার আদালত।
এছাড়া ২০২৩ সালের ৫ মার্চ ঢাকার ধামরাই উপজেলা থেকে ২০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় মো. সিয়াম মিয়া ও মো. সুজন মিয়া, ২০২২ সালের ২৫ জুন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে ৩০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় রায়হান, ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে ৭০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় মো. হাসান ওরফে হাসান মৃধা, ২০২৩ সালের ২৭ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে ৫০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় গাজী মো. শাহজাহান, ২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর গাজীপুরের কালীগঞ্জ থেকে ৫০০ গ্রাম হেরোইন ও ১০০টি ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় মাহমুদুল ইসলাম ওরফে রুমেল, ২০২২ সালের ২১ নভেম্বর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে ৫০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় আলহাজ আলী, ২০২৪ সালের ২১ জানুয়ারি ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে ১০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় মো. জসিম, ২০২৩ সালের ২৩ জুন ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থেকে ৩০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় মো. সুমন, ২০২১ সালের ৭ মে ঢাকার আশুলিয়া থেকে ৪১৮ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় নাজিম উদ্দিন এবং ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি যশোরের বেনাপোল পোর্ট থেকে ৫৪০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় জাহাঙ্গীর হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা গত ১২ মার্চ হাইকোর্টের একই বেঞ্চ থেকে ছয় মাসের জামিন পান। এরপর জামিন আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের শুনানি শেষে চেম্বার জজ আদালত তাদের জামিন আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, ২০১৮ অনুযায়ী এসব মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।