Saturday 11 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

পানিপ্রবাহ আটকে ৭২ ঘণ্টার তল্লাশিতে মিলল আয়াতের ‘দুই পা’

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
৩০ নভেম্বর ২০২২ ১৮:৫১ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২০২২ ১৯:৩৯

চট্টগ্রাম ব্যুরো: পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) উদ্ধার করা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন দু’টি পা নিখোঁজ শিশু আলীনা ইসলাম আয়াতের বলে তার বাবা ও স্বজনেরা শনাক্ত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে শিশুটিকে খুনের পর ছয় টুকরো করে সাগরে ভাসানোর যে দাবি গ্রেফতার হওয়া আবির আলী করেছিল, তার প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছেন পিবিআই কর্মকর্তারা।

পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিটের পুলিশ সুপার নাইমা সুলতানা জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশন, সিডিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় স্লুইচগেটের চারটি প্রকোষ্ঠের পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়ার পর একটি প্রকোষ্ঠে আটকে যাওয়া পলিথিনে পা দু’টি মিলেছে, যেগুলো আবিরের বর্ণনামতো পলিথিনের ভেতর কচটেপ দিয়ে মোড়ানো ছিল।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (৩০ নভেম্বর) দুপুরে নগরীর ইপিজেড থানার আকমল আলী রোডের শেষপ্রান্তে নালা সংলগ্ন স্লুইচগেট এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন দুই পায়ের অংশ পাওয়া গেছে। ৭২ ঘন্টার টানা অভিযানের পর আলামতগুলো উদ্ধার হয়েছে বলে জানান পিবিআই পরিদর্শক (মেট্রো) মোস্তাফিজুর রহমান।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, আয়াতের দুই পা উদ্ধারের খবরে সেখানে হাজির হয়েছেন তার স্বজনেরা। আশপাশের এলাকা থেকে হাজরো মানুষ জড়ো হন সেখানে। এসময় উত্তেজিত জনতা আবিরের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ করেন।

ঘটনাস্থলে পুলিশ সুপার (পিবিআই-মেট্রো) নাইমা সুলতানা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আয়াত নিখোঁজের ঘটনা তদন্তে নেমে আমরা প্রথমেই আবির আলীকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তখন প্রাথমিকভাবে সে তথ্য দিয়েছিল, আয়াতকে শ্বাসরোধে খুনের পর কেটে ছয় টুকরো করে সে। এরপর দুই হাত ও গলার নিচ থেকে কোমর পর্যন্তসহ তিনটি টুকরো ফেলে দেয় সাগরে। মাথা এবং দুই পা ফেলে এই স্লুইচগেটে নালায়। আমরা আবিরকে নিয়ে দুই দফা এখানে এসেছিলাম। জোয়ার-ভাটার হিসেব করে ভাটার সময় তল্লাশি করেছি। কিন্তু গতকাল (মঙ্গলবার) পর্যন্ত আমরা কিছুই পাইনি।’

সিটি করপোরেশন, সিডিএ ও পাউবো’র সহযোগিতা নেয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর মধ্যে সিডিএ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতা নিয়ে আমরা এই স্লুইচগেটের প্রকোষ্ঠগুলো বন্ধ করে প্রথমে পানিপ্রবাহ আটকে দিই। এখানে মোট চারটা প্রকোষ্ঠ আছে। গতকাল (মঙ্গলবার) থেকে একটির পর একটি করে প্রকোষ্ঠ খুলে পানিপ্রবাহ শুরু করা হয়। পানির সাথে খাল-নালা থেকে যেসব পলিথিন এসেছে সবগুলো সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীদের মাধ্যমে সংগ্রহ করে খুলে যাচাই করা হয়। তিনটি প্রকোষ্ঠ দিয়ে আসা পলিথিনে কিছুই পাওয়া যায়নি। আজ (বুধবার) চার নম্বর প্রকোষ্ঠ খোলার পর আসা পলিথিনের একটিতে দেহাবশেষ দুইটি পা পাওয়া গেছে।’

‘দুটি পা আয়াতের বলে তার মা-বাবা শনাক্ত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে আবির আলী আয়াতকে খুনের পর কেটে টুকরো করার যে তথ্য দিয়েছিল, তার সত্যতা প্রাথমিকভাবে প্রমাণ হয়েছে। আমরা অন্যান্য আলামত উদ্ধার করলেও দেহাবশেষ পাওয়াটা আমাদের জন্য জরুরি ছিল। আমাদের সব অফিসার গত এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন টিমে ভাগ হয়ে আবিরের দেখিয়ে দেওয়া জায়গাগুলোতে তল্লাশি করেছেন। আমাদের ধারণা, আয়াতের শরীরের আরও কিছু অংশ হয়তো পাওয়া যেতে পারে। আমরা যতদিন পারি, তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রাখবো।’- বলেন পিবিআইয়ের এসপি

ঘটনাস্থলে থাকা পিবিআই পরিদর্শক (মেট্রো) নিজাম উদ্দিন সারাবাংলাকে জানিয়েছেন, আবির আলী যেভাবে বর্ণনা দিয়েছিল, পা দু’টি সেভাবেই কচটেপ মোড়ানো একটি পলিথিনের ভেতরে পাওয়া গেছে। স্লুইচগেটে টানা তিনদিন তল্লাশির পর এই আলামত পাওয়া গেছে। পিবিআইয়ের ক্রাইম সীন টিম আলামতের নমুনা সংগ্রহ করেছে।

আয়াতের দেহখণ্ড উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তার বাবা সোহেল রানা ও দাদা মনজুর হোসেনসহ স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পলিথিন খুলে যখন তাদের পা-গুলো দেখানো হয়, তখন তারা বুক চাপড়ে আর্তনাদ করতে থাকেন। তারা বারবার আবিরের ফাঁসি দাবি করতে থাকেন।

কান্নায় ভেঙে পড়ে আয়াতের আত্মীয় এক নারী সাংবাদিকদের বলেন, ‘সে (আবির আলী) একটা মিথ্যুক, হিংস্র জানোয়ার। আমাদের মেয়ে তাকে চা্চু ডাকতো। সে ছোটবেলা থেকে আমাদের বাসায় বড় হয়েছে। মেয়েটাকে ‍খুন করে তার মায়ের বাসায় রেখে সন্ধ্যা ৭টার দিকে আয়াতের বাবাকে ফোন করে বলেছে- ভাইয়া, আমি আয়াতকে আদর করে রেখে এসেছিলাম, আমি তাকে খুঁজছি। মেয়েটার শরীরটাকে কেটে ফেলে দিয়ে সে সাতদিন ধরে আমাদের সঙ্গে তাকে খুঁজেছে। সে আয়াতের জন্য লিফলেটও বিতরণ করেছে।’

‘আমি তার ফাঁসি চাই। শুধু তার নয়, তার মা-বাবারও ফাঁসি চাই। তার মা, বাবা, বোন সবকিছু জানত। জানার পরও আমাদের কাছে এসে তার মা বলেছে, তার ছেলে আয়াতকে আদর করে বাসার সামনে রেখে গিয়েছিল। তার ছেলে এসবের সঙ্গে জড়িত নয়। আবিরকে গ্রেফতারের পরও তার মা বাসায় এসে একই কথা বলেছেন।’ – বলেন ওই নারী

আয়াতের দাদা মনজুর হোসেন পা-গুলো দেখিয়ে বলেন, ‘এগুলো আমার নাতনির পা। একটুও পচেনি, একটুও নষ্ট হয়নি। আরেকটু খোঁজ করলে এখানে তার মাথাটাও পাওয়া যাবে। সে (আবির) বলেছিল, এখানেই সে মাথাটা ফেলেছে।’

কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমাদের বংশে একটাই মেয়ে, আমার একমাত্র নাতনি। সবার আদরের ছিল। তাকে মেরে ফেলল। আমাদের বংশে আর কেউ রইল না। আমি দ্রুত ফাঁসি চাই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি, তাকে দ্রুত ফাঁসি দিন।’

আবির আলীর নৃশংসতায় স্থম্ভিত ঘটনার মূল সূত্র উদঘাটনকারী পিবিআই পরিদর্শক (মেট্রো) মর্জিনা আক্তার সারাবাংলাকে বলেন, ‘শরীরের খণ্ডগুলো খুঁজছিলাম আর মনে মনে আল্লাহকে বলছিলাম, মেয়েটাকে যেন জীবিত পাওয়া যায়। এমন নৃশংস মৃত্যু যেন না হয় ! আবিরের কথাগুলো যেন শেষ পর্যন্ত মিথ্যা হয়ে যায়। আজ (বুধবার) আমরা আবিরের বোনকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম। যখন শুনলাম, পা দুটো পাওয়া গেছে, নিজের আবেগ আর সামলাতে পারিনি।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক (মেট্রো) মনোজ কুমার দে সারাবাংলাকে বলেন, ‘শরীরের কিছু অংশ অন্তঃত উদ্ধারের মাধ্যমে প্রমাণ হল যে, আবিরই আয়াতকে খুন করেছে। এর ফলে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। তবে আরও বিস্তারিত তদন্তের প্রয়োজন আছে।’

গত ১৫ নভেম্বর বিকেলে নগরীর ইপিজেড থানার দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডের নয়ারহাট এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানার মেয়ে চার বছর ১১ মাস বয়সী আলীনা ইসলাম আয়াত নিখোঁজ হন। ১০ দিন পর ২৪ নভেম্বর পিবিআই আবির আলীকে গ্রেফতারের পর জানায়, আয়াতকে শ্বাসরোধে খুন করে লাশ কেটে ছয় টুকরো করে আবির। এরপর সেগুলো সাগরে ভাসিয়ে দেয়।

আবিরকে নিয়ে গত ২৫ নভেম্বর পিবিআই টিম তার বর্ণনা অনুযায়ী ঘটনাস্থলগুলোতে গিয়ে লাশ উদ্ধারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এরপর তার দেয়া তথ্য আরও যাচাইবাছাই এবং আনুষাঙ্গিক প্রমাণ সংগ্রহে পিবিআই তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করে। প্রথম দফায় ২৬ নভেম্বর আবিরকে দুইদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন আদালত।

২৭ নভেম্বর পিবিআই টিম আবারও তাকে নিয়ে ঘটনাস্থলগুলোতে গিয়ে লাশ উদ্ধারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ২৮ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় আরও সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এরপর ২৯ নভেম্বর আবিরের বাবা, মা ও ১৫ বছর বয়সী ছোট বোনকে গ্রেফতার করে আদালতের নির্দেশে তিনদিনের রিমান্ডে নেয় পিবিআই।

পিবিআইয়ের ভাষ্যমতে, মুক্তিপণ আদায়ের জন্য আয়াতকে অপহরণের পরিকল্পনা করে তাদের বাড়ির ভাড়াটিয়া আজহারুলের ছেলে আবির আলী। পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠ আবিরকে আয়াত ‘চাচ্চু’ বলে সম্বোধন করতো। ১৫ নভেম্বর বিকেলে বাসার সামনে থেকে আয়াতকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে আবির ঢুকে যায় তার বাবার বাসায়, যেখানে তখন কেউ ছিল না। সেখানে ১৫ মিনিটের মধ্যে শ্বাসরোধ করে আয়াতকে খুন করে আবির।

এরপর লাশ ব্যাগে ভরে নিয়ে যায় নগরীর আকমল আলী সড়কের পকেটগেট বাজার এলাকায় তার মা আলো বেগমের বাসায়। মা-বাবার মধ্যে বিচ্ছেদের পর আবির মায়ের বাসায় থাকত। তবে জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা যে এলাকায়, সেই বাবার বাসায়ও তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। আবির মায়ের বাসায় নিয়ে লাশ বাথরুমের তাকের ওপর লুকিয়ে রাখে। রাতে সেই লাশ বাথরুমে নিয়ে কেটে ছয় টুকরা করে ছয়টি ব্যাগে ভরে রাখে।

পরদিন ১৬ নভেম্বর সকালে লাশের তিনটি টুকরা নগরীর আকমল আলী রোডের শেষপ্রান্তে বেড়িবাঁধের পর আউটার রিং রোড সংলগ্ন বে-টার্মিনাল এলাকায় সাগরে ভাসিয়ে দেয়। ওইদিন রাতে বাকি তিন টুকরা আকমল আলী রোডের শেষপ্রান্তে একটি নালায় স্লুইচগেটের প্রবেশমুখে ফেলে দেয় আবির।

কিন্তু মুক্তিপণ আদায়ের জন্য সংগ্রহ করা সীম ব্লক থাকায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি আবির। আয়াতের খেলার সাথীদের কাছ থেকে তাকে কোলে নেয়ার তথ্য এবং সিসি ক্যামেরার ফুটেজে আবিরের গতিবিধি দেখে তাকে গ্রেফতার করে পিবিআই।

সারাবাংলা/আরডি/এনইউ
বিজ্ঞাপন

আরো