চট্টগ্রাম ব্যুরো: বিএনপির সমাবেশে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি হওয়া ‘যুদ্ধাপরাধী’ সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীর বক্তব্য-স্লোগানের সঙ্গে দলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানিয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার (১৩ অক্টোবর) সকালে নগরীর নাসিমন ভবনে দলীয় কার্যালয়ে সমাবেশ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী একথা বলেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদকে পাশে রেখে এ বিষয়ে দলের অবস্থান পরিষ্কার করেন খসরু।
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, পুলিশের গুলিতে ৫ নেতাকর্মী নিহত ও বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বুধবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর পলোগ্রাউন্ড মাঠে বিএনপির কেন্দ্রঘোষিত বিভাগীয় গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে বিএনপি সারাদেশে বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশ কর্মসূচি শুরু করেছে।
মঞ্চে থাকা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতাদের সামনে সমাবেশে হুম্মাম কাদের চৌধুরী সরকারের উদ্দেশে বলেন, ‘ক্ষমতা ছাড়ার পর একা বাড়ি ফিরতে পারবেন না।’ তিনি ‘নারায়ে তাকবীর’ স্লোগান দিয়ে বক্তব্য শেষ করেন, যে স্লোগান বিএনপি দলীয়ভাবে ব্যবহার করে না।
সমাবেশ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে হুম্মামের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এগুলো তার (হুম্মা) ব্যক্তিগত বক্তব্য। এগুলোর সঙ্গে দলের সম্পৃক্ততা নেই। এগুলো তার একান্ত ব্যক্তিগত বক্তব্য। দলের সঙ্গে এর কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। এসব বক্তব্য বিএনপির রাজনীতির অংশ নয়।’
এসময় আমীর খসরু হুম্মামের বিষয়ে তাদের অবস্থান ‘পরিস্কার’ হয়েছে কি না, সাংবাদিকদের কাছে সেটা জানতে চান।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী নিজেকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে পরিচয় দিয়ে বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘বেশি সময় নেব না। অনেক সিনিয়র নেতা এসেছেন। আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি নিজে কোন বড় নেতা হিসেবে নয়। আজকে এসেছি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হিসেবে। আপনারা সকলে সাথে থাকলে আমাদের পরাজিত করার শক্তি কারো নেই।’
সরকারের উদ্দেশে বলেন, ‘এই আওয়ামী লীগ সরকারকে বলে দিতে চাই, ক্ষমতা ছাড়ার পর একা বাড়িতে যেতে পারবেন না। বাধ্য করবো প্রত্যেকটা শহীদের বাড়িতে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে যেতে হবে।’
বক্তব্যের শেষপর্যায়ে বলেন, ‘যাবার আগে বাবার স্লোগান আপনাদের বলে যেতে চাই- নারায়ে তাকবীর, নারায়ে তাকবীর, নারায়ে তাকবীর। আমরা যখন আবার এই ময়দানে আসব সরকার গঠন করে ময়দানে আসব।’
হুম্মাম কাদের যখন ‘নারায়ে তাকবীর’ বলে তিনবার স্লোগান দেন, বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ‘আল্লাহু আকবর’ বলে জবাব দেন।
‘নারায়ে তাকবীর’ বিএনপি দলীয়ভাবে ব্যবহার না করলেও দলটির নেতা হিসেবে হুম্মামের বাবা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও চাচা গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী সবসময় এই স্লোগান দিতেন।
সমাবেশের পর এ বিষয়ে জানতে চাইলে করা চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহবায়ক শাহাদাত হোসেন সারাবাংলাকে বলেছিলেন, ‘নারায়ে তাকবীর আমাদের সাংগঠনিক স্লোগান নয়। পুরো সমাবেশে এই স্লোগান আর কোনো নেতা দেননি। উনি (হুম্মাম) দিয়েছেন উনার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে। দেয়ার আগে উনি নিজেই বলেছেন যে- বাবার স্লোগানটা দিচ্ছি। যেহেতু উনার বাবাও এই স্লোগানটা দিতেন, তাই ব্যক্তিগত চিন্তা থেকে হয়ত উনি দিয়েছেন।’
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে মানবতা বিরোধী বিভিন্ন অপরাধে অংশ নেয়া সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে। তারা বাবা তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ভূমিকায় ছিলেন। পাকিস্তানের পরাজয়ের হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২৮ ডিসেম্বর নৌযানে করে দেশ থেকে পালানোর পথে আনোয়ারা উপজেলার গহীরা উপকূলে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়েছিলেন ফজলুল কাদের। বন্দি অবস্থায় ১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই তার মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় আহত হয়ে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী দেশ ছেড়েছিলেন। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর তিনি দেশে ফিরে রাজনীতি শুরু করেন। মুসলিম লীগ, জাতীয় পার্টি, এনডিপি এবং ফাঁসিতে দণ্ডিত হওয়ার সময় পর্যন্ত তিনি বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর একাত্তরের মানবতা বিরোধীদের বিচার শুরু হলে সালাহউদ্দিন কাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। মানবতা বিরোধী অপরাধের দায় প্রমাণিত হওয়ায় সাকা চৌধুরীর ফাঁসির রায় দেন আদালত। ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর তার ফাঁসির রায় কার্যকর হয়।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির পর দৃশ্যপটে আসেন হুম্মাম কাদের। কিছুদিন রাজনীতির মাঠে থেকে পরে আবার পর্দার আড়ালে চলে যান। গত একবছর ধরে তাকে আবার সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। সাকা পরিবারের মধ্যে তার ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান পদে আছেন। তবে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় নন।