Friday 10 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

নিজ উদ্যোগে চামড়ায় লবণ দেওয়ার পরামর্শ আড়তদারদের

রমেন দাশগুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
৮ জুলাই ২০২২ ২১:৪০ | আপডেট: ৮ জুলাই ২০২২ ২১:৫৪

চট্টগ্রাম ব্যুরো: কোরবানির ইদের দিন মহানগরের বাইরে গ্রামগঞ্জ থেকে আসা কাঁচা চামড়া না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রামের আড়তদারেরা। গ্রামগঞ্জে মৌসুমী সংগ্রহকারীদের এবং মাদরাসা-এতিমখানা কর্তৃপক্ষকে নিজ উদ্যোগে কাঁচা চামড়ায় লবণ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। পরবর্তীতে লবণজাত চামড়াগুলো আড়তদারেরা সংগ্রহ করবেন।

কোরবানির দিনে মহানগরের বাইরের কাঁচা চামড়া সংগ্রহ না করার পক্ষে আড়তদারদের যুক্তি হচ্ছে- বছরের পর বছর ধরে লোকসান ও ধারদেনায় আড়তদারের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। লবণের দাম বেড়েছে, বেড়েছে আনুসঙ্গিক ব্যয়ও। এর ফলে সীমিতসংখ্যক আড়তদারের পক্ষে এত চামড়া একসঙ্গে কেনা এবং আড়তে এনে লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

সাধারণত মৌসুমী সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে সেগুলো আড়তে এনে লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে ট্যানারি মালিকের কাছে বিক্রি করেন আড়তদারেরা। কোরবানির পরপরই চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুর, বিবিরহাট, আতুরার ডিপো, বহদ্দারহাট, চৌমুহনীসহ বিভিন্ন স্পটে সংগ্রহ করা কাঁচা চামড়া নিয়ে আসেন মৌসুমী সংগ্রহকারীরা।

শহরের ভেতরে বিভিন্ন এলাকা থেকে যেমন চামড়া সংগ্রহ করা হয়, শহরের বাইরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকেও চামড়া আনা হয়। এতদিন ধরে গ্রাম-শহরভেদে সব চামড়াই আড়তদারেরা কোরবানির ইদের দিন থেকে সংগ্রহ করে আসছিলেন। এবার এর ব্যত্যয় ঘটতে যাচ্ছে বলে তারা জানিয়েছেন।

আগামী রোববার (১০ জুলাই) কোরবানির ইদ হবে। জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে এবার কোরবানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে মোট আট লাখ ২১ হাজার পশু। এর মধ্যে গরু পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার ৮০৩, মহিষ ৬৬ হাজার ২৩৭, ছাগল ও ভেড়া এক লাখ ৮৯ হাজার ৬২ এবং অন্যান্য ৯৯টি পশু রয়েছে। ২০২১ সালে সাত লাখ ৪২ হাজার ৪৫৫টি পশু কোরবানি হয়েছিল।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি এবার গরু, ছাগল, মহিষ মিলিয়ে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ মুসলিম উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আড়তদারের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। আগে ৫-৬ লাখ চামড়া সংগ্রহ করত ২৫০ থেকে ৩০০ আড়তদার মিলিয়ে। এখন চট্টগ্রামে আড়তদারের সংখ্যা ৫০ জনেরও কম। তাহলে ৭-৮ লাখ চামড়া যদি আমাদের সংগ্রহ করে লবণ দিতে হয় এটা আমাদের জন্য বোঝা হয়ে যাবে, আমরা পারব না। চামড়া প্রসেস করার খরচ বেড়েছে, লবণের দাম বেড়েছে, শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে। একটি চামড়া প্রসেস করতে ২০০ থেকে ২২০ টাকা খরচ পড়বে।’

‘তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এবার কোরবানির দিন শুধু শহরের ভেতরে যেসব পশু কোরবানি হবে, সেগুলোর চামড়াই আমরা নেব। উপজেলা, গ্রামগঞ্জ থেকে যেসব চামড়া আসে, আমাদের পরামর্শ হচ্ছে- সেগুলো সংগ্রহকারীরা নিজেরাই যেন লবণ দিয়ে রাখে। কাঁচা চামড়া আগের মতো শহরে নিয়ে এলে আমরা নেব না। এখন গরমকাল চলছে। চামড়া ফেলে রাখলে নষ্ট হয়ে যাবে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, অতিরিক্ত দামে যাতে না কেনে। মৌসুমী সংগ্রহকারীরা অতিরিক্ত দামে কিনলে আমরা তাদের থেকে সেই দামে নিতে পারব না।’

সংগঠনটির সহ-সভাপতি আবদুল কাদের সারাবাংলাকে জানিয়েছেন, ২০১৪ সালেও অন্তঃত ২৫০ জন আড়তদার কাঁচা চামড়ার ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। এদের অনেকেই ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে চামড়া বিক্রির পর্যাপ্ত পাওনা না পেয়ে লোকসান দিয়ে এখন নিঃস্ব হয়ে গেছেন। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ট্যানারি মালিকদের কাছে চট্টগ্রামের আড়তদারদের অন্তঃত ২৮ কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। পুঁজির অভাবে এখন আড়তদারের সংখ্যা ৩৭ জনে নেমে এসেছে।

চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লবণের দাম গত বছরের চেয়ে অন্তঃত ৪০০ টাকা বেড়েছে। গত বছর ৭৪ কেজি লবণের বস্তা ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, যার দাম এখন এক হাজার টাকা।

আবদুল কাদের বলেন, ‘১০০টি চামড়া সংরক্ষণের জন্য এক বস্তা লবণের প্রয়োজন হয়। এর সাথে আছে শ্রমিকদের মজুরি, গুদাম খরচসহ আনুষাঙ্গিক ব্যয়। চট্টগ্রামে মাত্র একটি ট্যানারি আছে। অধিকাংশ চামড়া প্রসেস করে আমাদের ঢাকায় পাঠাতে হয়। ট্যানারি মালিকরা চামড়া কেনার সময় ২০ শতাংশ কর্তন করে চামড়া কিনে থাকে। আবার চট্টগ্রামে বিক্রি না হলে সেসব চামড়া ঢাকায় পাঠানোর প্রয়োজন হয়, সেখানে প্রতি চামড়ায় ৩০ টাকা করে আড়তের খরচ দিতে হয়। হিসেব করলে প্রতিটি চামড়ার জন্য অন্তত ২৭০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ হয় আড়তদারদের।’

‘সুতরাং সরকার যে দর নির্ধারণ করে দেবে, সেই দরে যদি মৌসুমী সংগ্রহকারীরা চামড়া কেনেন, তাহলে আমরা তার চেয়ে বেশি দামে তাদের কাছ থেকে চামড়া কিনতে পারব না। এখন তারা যদি নিজেরাই প্রসেস করে রাখে, তাহলে আমরা পরবর্তীতে একটা হিসেব করে তাদের থেকে সেটা কিনতে পারব।’

উল্লেখ্য, প্রতিবারের মতো এবারও কোরবানির পশুর চামড়ার দর নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। গরুর চামড়া ৭ টাকা এবং খাসির চামড়ার দর ৩ টাকা বাড়ানো হয়েছে এবার। এবার ঢাকায় লবণযুক্ত চামড়া কিনতে হবে প্রতি বর্গফুট ৪৭ থেকে ৫২ টাকা দরে। আর ঢাকার বাইরের দর ৪০ থেকে ৪৪ টাকা। এছাড়া সারা দেশে লবণযুক্ত খাসির চামড়ার দর ৩ টাকা বাড়িয়ে প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ থেকে ২০ টাকা। তবে বকরির চামড়ার দর আগেরটাই থাকছে, অর্থাৎ ১২ থেকে ১৪ টাকা।

সারাবাংলা/আরডি/এমও